আশাহত হলেও বাড়ল ভারতবাসীর আশা । কাশীনাথ ভট্টাচার্য
কাশীনাথ ভট্টাচার্য
দক্ষিণ কোরিয়ার বালকদের দলে কোনও ‘ভিভ রিচার্ডস’ ছিল
না! ভারতের অনূর্ধ্ব১৬ অধিনায়ক বিক্রম প্রতাপকে যদি সে সে-ই যাচিত
সুযোগ দিত হাতে তুলে! কিংবা, গিভসন
সিংয়ের শট যদি ৫২ মিনিটে ধরতে না পারত দক্ষিণ কোরিয়ার গোলরক্ষক শিন সোং। হয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক নিত দেশের ফুটবল ইতিহাস।
এএফসি অনূর্ধ্ব১৬ প্রতিযোগিতার
কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ০-১ হারল ভারত। ছিটকে গেল প্রতিযোগিতা
থেকে। পেরুতে ২০১৯-এ অনুষ্ঠেয় অনূর্ধ্ব১৭ বিশ্বকাপ থেকেও। এএফসি থেকে চার দেশ
সুযোগ পাবে অনূর্ধ্ব১৭ বিশ্বকাপে। সেমিফাইনালে উঠতেই হত তাই। মালয়েশিয়ার পেতালিং
জয়া স্টেডিয়ামে পরিবর্ত জেওং সাং-বিনের ৬৮ মিনিটের গোলে স্বপ্নভঙ্গ আপাতত। শুরু
নতুন করে স্বপ্ন দেখা। এত কাছে এসে ফিরে যাওয়ার যন্ত্রণাই বুনে দিল নতুন স্বপ্নের
বীজ!
![]() |
| নামগুলো মনে রাখুন। যারা ভারতকে নিয়ে এসেছিল বিশ্বকাপের দোরগোড়ায়। ছবি - টুইটার থেকে |
খাবিয়ের সেপ্পি টুইট করেছিলেন ২৭
সেপ্টেম্বর। যে রাতে ভারতীয় কিশোরদের সামনে খুলে গিয়েছিল বিশ্বকাপের দুয়ার। অনূর্ধ্ব১৬
দল গ্রুপে রানার্স হয়ে এএফসি প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার ছাড়পত্র আদায়
করেছিল। ভারতে ফুটবল দেখানোর অন্যতম প্রধান টেলিভিশন সংস্থাকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন
সেপ্পি, ‘ এএফসি-র সব ম্যাচ দেখানোর স্বত্ত্ব কি স্টার স্পোর্টসের নয়? সোমবার ভারত
এমন ম্যাচ খেলবে যা খুলে দিতে পারে বিশ্বকাপের দরজা।’ যাঁরা ভুলে গিয়েছেন, মনে
করিয়ে দেওয়া যাক, এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে সফল অনূর্ধ্ব১৭ বিশ্বকাপ ভারতে ২০১৭ সালে
অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেপ্পির প্রশাসনিক নেতৃত্বে। ভারত তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করেছে,
ভারতীয় ফুটবলের সরব সমর্থক এখন। কাজ
হয়েছিল তাঁর টুইটে। স্টার বাধ্য হয় আইএসএল সরিয়ে রেখে কুয়ালালামপুর থেকে এই ম্যাচ
সরাসরি সম্প্রচার করতে।
ভারতের ফুটবলমহল সুযোগ হাতছাড়া
করেনি। টেলিভিশনের সামনেই ছিলেন সবাই বুঝিয়ে দিয়েছিল সোস্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন
প্ল্যাটফর্ম। ভারতের সিনিয়র দলের অধিনায়ক সুনীল ছেত্রী তো ইনস্টাগ্রামে বার্তাই
দিয়ে রেখেছিলেন বাচ্চাদের জন্য, ‘নিশ্চিন্তে খেলো, আমরা দেখছি তোমাদের’।
খেললও তারা। অনূর্ধ্ব১৬ বা সদ্য-ষোল।
জান লড়িয়েই দিল প্রতিযোগিতার শ্রেষ্ঠ দলের বিরুদ্ধে। গ্রুপে তিন ম্যাচে যারা
করেছিল ১২ গোল, একটিও না-খেয়ে। ভারতও খায়নি গোল সেই তিন ম্যাচে। কোয়ার্টার ফাইনালে
রক্ষণের অন্যতম সেরা বিকাশ ইউমনামকে না-পেয়েও প্রথম ৪৫ মিনিট গোল দিতে দেয়নি
দক্ষিণ কোরিয়াকে। তিনকাঠির তলায় নীরজ কুমার দুর্ভেদ্য তখন। অন্তত চারবার নিশ্চিত
গোল বাঁচিয়ে নায়ক।
দ্রুতগতিতে আক্রমণ প্রধান অস্ত্র
দক্ষিণ কোরিয়ার, বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন ম্যাচের আগেই। বিবিয়ানো ফেরনানদেসের প্রশিক্ষণে
ভারত প্রস্তুত ছিল সামলাতে। গোল পেতে দক্ষিণ কোরিয়াকে অপেক্ষা করতে হল ৬৮ মিনিট,
তা-ও পড়ে-পাওয়া গোল। নিচু হয়ে-আসা শট
বাঁচিয়েছিল নীরজ। ফিরতি বল চলে গিয়েছিল আগুয়ান অরক্ষিত জেওংয়ের পায়ে।
প্রথমার্ধে নিজেদের অর্ধে নিচে নেমে
খেলে আক্রমণ শুষে নেওয়ার কাজ করতে করতে দ্বিতীয়ার্ধে বিশেষত গোল খাওয়ার পর
আক্রমণেও এসেছিল ভারতীয়রা। দু-অর্ধে যদিও দুটির বেশি সুযোগ আসেনি বিপক্ষের গোলে শট
নেওয়ার। ওই দুবারই যা কোরীয় গোলরক্ষককে ব্যস্ত দেখা গিয়েছিল। পাসিং দুরন্ত এবং
দ্রুত, বল মাটিতে এবং পায়ে রেখে খেলতে অভ্যস্ত দক্ষিণ কোরিয়াকে কিন্তু গোলের পরও
ব্যবধান বাড়াতে দেয়নি ভারত। কৌশলগত লড়াইয়ে কোনও দলের চেয়ে একফোঁটাও পিছিয়ে, মনে হয়নি
চার ম্যাচে। নিশ্চিতভাবেই যা সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ২০১৭ অনূর্ধ্ব১৭ বিশ্বকাপ থেকে
উঠে এসেছিলেন গোলরক্ষক ধীরজ সিং মৈরাংথেম। ২০১৮ এএফসি কাপ দিয়ে গেল নীরজ কুমারকে।
এশীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় চার ম্যাচে
একটিই গোল, তা-ও নকআউটে, নিয়ে ফিরছে নীরজ-বিক্রম-গিভসনরা। নিজেরা আশাহত হলেও
বাড়িয়ে দিয়েছে দেশবাসীর আশা। ‘পৃথিবী তাকিয়ে দ্যাখো’। ঘুমন্ত দৈত্য জাগছে। এমন
দিনেই তো বলা যায়, জোরগলায়!

No comments