কাশীনাথ ভট্টাচার্য ● কলকাতা
২ অক্টোবর ২০২৬
‘ব্রাজিলকে আমরা হাল্কাভাবে নিচ্ছি না’!
বলে ফেললেন ভারতের কোচ খালিদ জামিল। কলকাতার জেডব্লু ম্যারিয়টের হোটেলের গঙ্গা ব্যাঙ্কোয়েট হলের সেই মুহূর্তে তৈরি হওয়া ফিসফাস শেষ পর্যন্ত কানে কানে পল্লবিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ল বাইপাস ধরে আরও অনেকটা এসে বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের প্রেস সেন্টারেও। অবাক হলেও কেউই অবশ্য খালিদকে দোষারোপ করেননি। ‘বলেছেন, তবে না–বুঝে’, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দরাজ শংসাপত্র খালিদের জন্য। সহানুভূতির সঙ্গে থাকল অবশ্য সতর্কতাও, ভবিষ্যতে এমন আর না বললেই ভাল!
বিপক্ষকে হাল্কাভাবে নেওয়ার প্রশ্ন থাকে দুটি ক্ষেত্রে। এক, বিপক্ষের চেয়ে অনেক এগিয়ে। দুই, বারবার দেখায় বিপক্ষকে বারবার হারানোর পর। শ্রেয়স আয়ারের ভারত যেমন টি২০–তে পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়ার আগে বলতেই পারে, আগে সাতাশবার হারানোর পরও ‘হাল্কাভাবে’ না–নেওয়ার কথা। কিংবা, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে পঞ্চম ব্রাজিল বলতে পারে ১৩৮ নম্বরে–থাকা ভারত সম্পর্কে। কিন্তু, এমন তো ব্রাজিলের ইতালীয় কোচ কার্লো ‘ডন’ আনচেলোত্তিও বলেননি! উল্টে, বিশ্বকাপে আর্লিং হাল্যান্ডকে থামানোর চিন্তা করছিলেন, ভারতের কোনও ফুটবলারকে নিয়ে চিন্তা করছেন কিনা প্রশ্নে তো রায়ান উইলিয়ামসের নামও বললেন আনচেলোত্তি। এমনকি জানালেনও, ভারতের শেষ ছয়টি ম্যাচ নাকি তিনি ও তাঁরা অর্থাৎ ব্রাজিলের সঙ্গে থাকা বিশেষজ্ঞের দল দেখেছেন, কাটাছেঁড়াও করেছেন। দেশ হিসাবে ভারতের তুমুল প্রশংসাও করলেন আনচেলোত্তি এবং তাঁর অধিনায়ক মারকিনিওস।
খালিদের অবশ্য অত ভাবনার ব্যাপার নেই। ফুটবলার জীবন থেকেই কম কথার মানুষ। সহজ কথা সহজে বলেন। বিতর্ক থেকে হাজার মাইল দূরে তাঁর ঠিকানা। ‘ইতিবাচক থাকতে হবে, যতটা সম্ভব কম ভুল করতে হবে, মাঠে নেমে ১০০ শতাংশ দিতে হবে, ব্রাজিল দুর্ধর্ষ দল, আক্রমণ ও রক্ষণে দুর্দান্ত ভারসাম্য’ গোছের কথাগুলো একেবারেই খালিদসুলভ। শুধু, এই হাল্কাভাবে না–নেওয়ার প্রসঙ্গেই যেটুকু অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বলে ব্যাট চালানো! অপ্রয়োজনীয়। দেশের কোচ হলে কী বলতে হবে না, জানাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে, হয়তো এই মন্তব্যের পর তাঁকে বুঝিয়ে দেবেন উচ্চপদস্থ কর্তারা। অবশ্যই যদি তাঁরাও বুঝতে পারেন!
যাই হোক, রাত পোহালেই কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভারতীয় সিনিয়র ফুটবল দলের সামনে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের দেশের নেইমার অবসর নিয়েছেন, কাসেমিরোকে জাতীয় দলের হয়ে আর খেলাবেন না জানিয়ে দিয়েছেন আনচেলোত্তি, চোট পেয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে বার্সেলোনায় ফিরে গিয়েছেন রাফিনিয়া। ২০২৬ বিশ্বকাপে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে এগারজন আছেন কলকাতায় এসে পৌঁছনো ব্রাজিল দলে যাঁদের আটজনের নাম রীতিমতো ভয়ধরানো — মারকিনিওস, মার্গালায়েস, দোগলাস সানতোস, ব্রুনো গিমারায়েস, দানিলো সানতোস, বিনিসিউস জুনিয়র, এনদ্রিক, গাব্রিয়েল মার্তিনেই। আনচেলোত্তি অবশ্য কোনও প্ররোচনাতেই কান দেননি এবং শনিবারের প্রথম একাদশ সম্পর্কে বারদুয়েক প্রশ্নে এক–শব্দে উত্তর দিয়েছেন — ‘নো’!
ভদ্রতার প্রতিমূর্তি আনচেলোত্তি তো চির–অচেনা খালিদকে জড়িয়ে ধরে ‘বেস্ট অফ লাক’ বলেই মঞ্চ থেকে নেমেছিলেন। ২০০২–এর পর কেন ব্রাজিল আর বিশ্বকাপ জেতেনি প্রসঙ্গে আনচেলোত্তি যদিও বললেন তাঁর পক্ষে সব কারণ বোঝা সম্ভব নয়, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের মন জিতে নিলেন ব্রাজিল–ফুটবলের কোন জিনিসটা পাল্টাতে চান না প্রশ্নের উত্তরে — ‘চাই, ফুটবল খেলার খুশিটা চিরকাল জুড়ে থাকুক ব্রাজিলের ফুটবলের সঙ্গে।’
জোগো বোনিতো বা সুন্দর ফুটবলের দেশে এখনও ফল্গুর মতোই অন্তঃসলিলা, বয়ে চলে সেই পায়ে–বলের আনন্দধারা, যা, হয়তো, ভারতকে সেই ১৯৫২ অলিম্পিকে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ১–১০ হারানোর গ্লানি মনে করাবে না শনিবার যুবভারতীতে!












