• Breaking News

    ক্লিন্সম্যান, আর্জেন্তিনা, ডাইভ, লালকার্ড, বিতর্ক…

    কাশীনাথ ভট্টাচার্য

    klinsmann

    য়ুরগেন ক্লিন্সম্যান আর আর্জেন্তিনা মানেই বিতর্ক! ডাইভ, লালকার্ড, মারামারি, ঘুষোঘুষি, লাথালাথি – আরও কত কী!

    শুরু সেই ১৯৯০ সালে। বিশ্বকাপের ফাইনাল ইতালিতে। লোথার ম্যাথাউসের পশ্চিম জার্মানির সামনে দিয়েগো মারাদোনার আর্জেন্তিনা। রোমের স্তাদিও ওলিম্পিকো-তে, ৮ জুলাই। ম্যাচজুড়েই ঘটনার ঘনঘটা। মেহিকোর (মেক্সিকো) রেফারি এদগার্দো কোদেসালের হাতে ছিল না ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ। দুই দলই পেনাল্টির আবেদন করেও পায়নি। নানা সিদ্ধান্তে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন ফুটবলাররা, বিশেষত মারাদোনা। পরে, সবচেয়ে কুৎসিত ফাইনাল হিসাব চিহ্নিতও হয়েছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে।

    তবে, সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় ৬৫ মিনিটে পেদ্রো মোনজোনকে দেখানো লালকার্ড। মোনজোন মাঠে এসেছিলেন অস্কার রুজেরির পরিবর্ত হিসাবে, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে। ক্লিন্সম্যান তাঁকে পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আটকাতে গিয়ে মোনজোনের পা উঠে গিয়েছিল। স্টাড দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু খুব বেশি হলে ফাউল দেওয়া যেত। ক্লিন্সম্যান হাত-পা ছড়িয়ে মাটিতে পড়ে সেই অবস্থাতেই আরও বার তিনেক মাটিতেই গড়াগড়ি দেন এমনভাবে, রেফারি সঙ্গে সঙ্গেই এসে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে দেন মোনজোনকে। মাত্র ১৫ মিনিট মাঠে থেকেই লালকার্ড। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে সেই প্রথম। পরে, ইংল্যান্ডের অবজার্ভার স্পোর্টস মান্থলি-র হিসাবে তা জায়গা করে নিয়েছিল সেরা ‘ডাইভ’ তালিকায় দুনম্বরে!

    ক্লিন্সম্যান তারপরও দিব্য খেলে চালিয়ে গিয়েছিলেন, কোনও অসুবিধাই হয়নি। হওয়ার কথাও ছিল না। কারণ মোনজোনের বাড়ানো পা তো লাগেইনি ক্লিন্সম্যানের পায়ে! কোদেসালকে অবশ্য থামানো যায়নি সেই দিন। পরে গুস্তাভো দেজোত্তিকেও লালকার্ড দেখিয়েছিলেন। আর্জেন্তিনা ম্যাচ শেষ করেছিল ন’জনে। আর পশ্চিম জার্মানি জিতেছিল বিতর্কিত পেনাল্টিতে। রোবের্তো সেনসিনি ফাউল করেছিলেন রুডি ফোলারকে, পেনাল্টি থেকে আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের গোলে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ২-৩ হারের প্রতিশোধ নিয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়া মারাদোনার, যদিও গোটা প্রতিযোগিতায় অ্যান্টি-ফুটবলের সমর্থক ছিল মারাদোনার নেতৃত্বে আর্জেন্তিনাই!

    কিন্তু, বিশ্বকাপ ফাইনালে ওভাবে বিপক্ষের কাউকে লালকার্ড দেখাতে রেফারিকে সাহায্য করতে আর কাউকে কখনও দেখা যায়নি ক্লিন্সম্যানের মতো, এ-ও সত্যি!

    আবার আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে ক্লিন্সম্যান এসেছেন যখন, বিতর্ক আবারও ঘিরে থেকেছে ম্যাচ। সেই ঘটনা ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে। এবার ক্লিন্সম্যান কোচ, সংযুক্ত জার্মানির। নিজেদের দেশে কোয়ার্টার ফাইনাল, খোসে পেকারমানের আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে। ম্যাচ ১-১। অতিরিক্ত সময়ে আর কোনও গোল না হওয়ায় টাইব্রেকার। এবং, সমস্যা শুরু!

    klinsmann2

    জার্মান অধিনায়ক মাইকেল বালাকের মতে, ঝামেলাটা শুরু করেছিল আর্জেন্তিনার ফুটবলাররা। যখনই কোনও জার্মান ফুটবলার পেনাল্টি নিতে যাওয়ার জন্য হাঁটতে শুরু করছিল, মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে-থাকা আর্জেন্তিনীয়রা অনেক কিছু বলছিলেন, বেশ জোরে জোরেই। বালাকের মতে, ‘স্প্যানিশে বলছিল। মানে আমরা কিছুই বুঝিনি। কিন্তু, মানে না বুঝলেও অসুবিধা হয়নি ওদের উদ্দেশ্য বুঝতে। আমাদের পেনাল্টি নিতে-যাওয়া ফুটবলারদের মনঃসংযোগ ভেঙে দিতে চেয়েছিল। আর তাই টিম বরোস্কি গোল করে এসে যখন ওদের দিকে তাকিয়ে মুখে আঙুল রাখে, ওরা যেন সবাই পাগল হয়ে গিয়েছিল!’

    আর্জেন্তিনীয়রা অবশ্য এ-অভিযোগ মানেনি, স্বাভাবিক কারণেই। তাঁদের মত, বরোস্কি এসে উস্কে দিয়েছিলেন, সবাইকে চুপ করে থাকার নির্দেশ দিয়ে। আয়ালা ও কাম্বিয়াসো গোল করতে না-পারার পর ভেঙে যায় ধৈর্যের বাঁধ। সাইডলাইন থেকে আর্জেন্তিনীয় এবং জার্মান ফুটবলাররা ছুটে আসেন। জার্মানির টরস্টেন ফ্রিনজস ও আর্জেন্তিনার ফাব্রিসিও কোলোচিনিকে দেখা যায় যুদ্ধে মত্ত, ক্লিন্সম্যান তাঁদের দুজনকে থামানোর চেষ্টা করছেন। মাক্সি রদরিগেজের গুষি আছড়ে পরে বাস্তিয়ান সোয়াইনস্টেগারের মাথার পেছনে। ফরিনজস আর আর্জেন্তিনার অধিনায়ক খুয়ান পাবলো সোরিনের মধ্যে একপ্রস্থ লড়াই। গাব্রিয়েল হাইনজ ও জার্মানির জেনারেল ম্যানেজার অলিভার বিয়েরহফের মধ্যে তীব্ক কথা কাটাকাটি। এরই মাঝে আর্জেন্তিনার রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে লিয়ান্দ্রো কুফ্রের তেড়ে আসা এবং তারপরই পের মার্টেস্যাকারকে দেখা যায় মাটিতে শুয়ে ছটফট করতে। মাঠে খন্ডযুদ্ধ। দুই কোচ ক্লিন্সম্যান আর পেকারমান নিজেদের ফুটবলারদের সামলাতে ব্যস্ত ও ব্যর্থ।

    যদিও তারপর সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে দুজনেই বলেন, মাঠের উত্তেজনায় এমন হয়েই থাকে, খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নেই। রেফারি কুফ্রে-কে লাল কার্ড দেখান।

    ক্লিন্সম্যান এই ঘটনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, ঠিক। কিন্তু, তিনি মাঠে ছিলেন জার্মানির চিফ কোচ হিসাবে। তাঁর দল খেলেছিল আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে এবং মাঠে গন্ডগোল হয়েছিল, তথ্য হিসাবে কোনও ভুল নেই!

    আবার ক্লিন্সম্যান, আবার মুখোমুখি আর্জেন্তিনার। এবার অবশ্য কোপা আমেরিকার শতবর্ষে। এবং এবারও ক্লিন্সম্যানের দল খেলবে ‘হোম ম্যাচ’। মানে, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, কোপার শতবার্ষিকীতে যারা উৎসাহী হয়ে এই প্রতিযোগিতার আয়োজক হয়েছেন। এবার কি লিওনেল মেসিকে আটকাতে আলাদা কোনও ব্যবস্থা নেবেন ক্লিন্সম্যান?

    ২০০৬ বিশ্বকাপের ওই ম্যাচে জার্মানির বিরুদ্ধে মেসিকে খেলানোর সাহস দেখাতে পারেননি পেকারম্যান। চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তখন। মাঝের এই দশ বছরে মেসি পাঁচবার তুলে নিয়েছেন বিশ্বসেরা ফুটবলের পুরস্কার। যুদ্ধটা তাই মাঠের বাইরেও। মেসিকে আটকানোর জন্য কী ছক করেন ক্লিন্সম্যান, আমেরিকাও তাকিয়ে আছে, দেখতে-জানতে-বুঝতে!

    No comments