‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলের ৩০ বছর পূর্তি আজ | কাশীনাথ ভট্টাচার্য
গোল-চুরির আজ তিরিশ বছর পূর্ণ হল!
কোনও কোনও চুরি ইতিহাস-বিখ্যাত। যেমন দিয়েগো মারাদোনার হাত-গোল। তেমনই বিখ্যাত পা-গোলও, যা করেছিলেন ওই একই দিন, ২২ জুন, ১৯৮৬। মেহিকোর (মেক্সিকো) এস্তাদিও আজতেকা-য়, চার মিনিটের ব্যবধানে। বিশ্বকাপের কো্যার্টার ফাইনালে বিপক্ষ ছিল ইংল্যান্ড। যে-গোলের জ্বালায় আজও জ্বলেপুড়ে খাক এখনও। তবু, লেখায় খামতি বা কমতি নেই!
বহু চর্চিত হলেও তিরিশ বছর আগের ঘটনা যখন, একটু পিছিয়ে যাওয়াই যাক। খেলার তখন ৫১ মিনিট। বাঁদিক থেকে ভেতরে ঢুকে আসছিলেন মারাদোনা। আসার পথে বলটা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের পেনাল্টি বক্সের দিকে। ভেবেছিলেন হোর্খে ভালদানোর সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে নেবেন। বলটা বাড়িয়ে তাই নিজেও এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বলটা ভালদানোর পায়ে যায়নি। ইংরেজ মিডফিল্ডার স্টিভ হজ নেমে এসেছিলেন, তাঁর পায়ে লেগে উঠে বল চলে গিয়েছিল পেছনে। মারাদোনা এবং ইংল।আন্ডের গোলরক্ষক-অধিনায়ক পিটার শিলটন, দুজনেই লাফিয়েছিলেন বলের জন্য। দেখা যায়, বল আশ্রয় নিয়েছে জালে, মারাদোনা দৌড়চ্ছেন সাইডলাইনের দিকে আর রেফারির দিকে দৌড়চ্ছেন শিলটন ও হডল!
রেফারি ছিলেন তিউনিসিয়ার আলি বিন নাসের। তাঁর মাথায় আসেনি ৫ ফুট ৫ ইঞ্চির মারাদোনা কী করে ৬ ফুটের শিলটনের চেয়েও বেশি লাফিয়ে মাথা ছোঁয়াতে পারে বলে। শিলটনের আবার হাত ব্যবহারের অনুমতিও আইনসঙ্গত, মারাদোনার যা নয়। মারাদোনা দৌড়চ্ছিলেন পাগলের মতো। সাইডলাইনের দিকে বারবার তুলে দেখাচ্ছিলেন মুষ্টিবদ্ধ হাত। সতীর্থদের বলেছিলেন উৎসবে মেতে উঠতে, দ্রুত। রেফারি যাতে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত না নিতে পারেন, অত্যন্ত স্বাভাবিক মনে হয় সব কিছুই। ভালদানো কী করে যেন বুঝেছিলেন। এসে বারণ করেছিলেন, হাতটা ওভাবে উত্তেজিত হয়ে বারবার না দেখাতে দর্শকদের। খেলার মাঝে রেফারি অবশ্য অতশত ভাবতে পারেননি। লাইন্সম্যানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, ওইটুকুই। গোলের বাঁশি বাজিয়ে দেন। জীবন মুচকি হেসে মারাদোনাকে দিয়ে গিয়েছিল আজীবন বিখ্যাত থাকার রসদ!
"un poco con la cabeza de Maradona y otro poco con la mano de Dios", ম্যাচ শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে যা বলেছিলেন মারাদোনা তারপর। স্পেনীয় বাক্যটি বাংলায়, ‘খানিকটা মারাদোনার মাথা দিয়ে আর বাকিটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’ শুরু সেই তিন শব্দের বন্ধনী, ‘হ্যান্ড অফ গড’। বিশ্বকাপ ফুটবল সম্পর্কে যার সামান্য উৎসাহও আছে, এই তিনটে শব্দ তার অজানা থাকতে পারে না, নেই। আর ইংরেজদের ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবের কথা মাথায় রেখে ওই গোল সম্পর্কে মারাদোনার মন্তব্য লিপিবদ্ধ আছে আত্মজীবনীতে। ওটাও কম মজাদার নয়। ‘যা ব্যাটারা, গির্জায় গিয়ে কেঁদে আয় খানিক!’
এবার ঈশ্বরের পা!
চার মিনিট সময় মাঝে। কে জানে কী মনে হয়েছিল তাঁর। নিজেদের অর্ধে বলটা ধরে এগোতে শুরু করলেন। পেরিয়ে গেলেন ইংল্যান্ডের চার ডিফেন্ডারকে – বিয়ার্ডসলে, রিড, বুচার, ফেনউইক। তারপর, শিলটনকেও। ফাঁকা গোলে ঠেলে দিলেন বল। ইংল্যান্ড নাকি তখনও প্রথম গোলের শোক সামলে উঠেতে পারেনি, লিখেছিলেন ব্রায়ান গ্ল্যানভিল। সামলে উঠতে তো আজ এই তিরিশ বছর পরও পারেনি, তাতে কী? আসলে ইংরেজই তো, তাই বলে যাওয়ার চেষ্টা, অমন একটা গোল খাওয়ার অসহায়তা থেকে সহ-ইংরেজদের বাঁচাতে ছেঁদো যুক্তির অবতারণা। যে গতিতে ওই দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন মারাদোনা, ওই ইংরেজ ডিফেন্ডারদের কারও পক্ষে সম্ভব হলে তখনই থামিয়ে দিতেন। বিশেষত বুচার যাঁকে ওই দৌড়ের সময় দু-দু’বার কাটিয়ে বেরিয়েছিলেন মারাদোনা। এক ফুটবলার ওভাবে নিজেদের অর্ধে বল ধরে বিপক্ষের মোট ফুটবলারদের অর্ধেককে কাটিয়ে গোল করে আসছে, এই অবমান্নাই বা ইংরেজরা রাখবে কোথায়!
ফলে একই ম্যাচে শতাব্দীর শরেষ্ট চুরি-গোল, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সৎ গোল! এই বৈপরীত্য দিয়েগো মারাদোনার সঙ্গেই মানানসই। মনে রাখবেন, মারাদোনার কিন্তু সত্যবাদী যুধিষ্ঠির হওয়ার কোনও বাসনা কখনও ছিল না। ছোটবেলায় একবার হাত দিয়ে গোল করেছিলেন। রেফারি খুব বকেছিলেন তাকে, পাত্তাই দেননি। ইতালিতে সিরি আ খেলতে গিয়েছিলেন যখন, জিকো খেলতেন উদিনেসে-তে। সেবার জিকোর বিদায়ী মরসুম। নাপোলির সঙ্গে খেলা উদিনেসের। মারাদোনা ওই ম্যাচেও হাত দিয়ে গোল করেছিলেন, যা দেখে জিকো রাগে অগ্নিশর্মা সেই দিন। কিছুতেই মানতে পারেননি কোনও ফুটবলার, তা-ও আবার মারাদোনার মাপের, এমন করতে পারেন। মারাদোনার তাতে বয়েই গেছে! পরিষ্কারই বলে থাকেন, রেফারি ধরতে না পারলে তা রেফারির দোষ, আমার হতে যাবে কেন!
তিরিশ বছর পেরিয়ে গেল, আরও কত তিরিশ বছর যে এভাবেই কেটে যাবে এই ‘হ্যান্ড অফ গড’ চর্চায়!
No comments