ব্রাজিল – ৪ (এস্তেবাও ২৯, পেদ্রো ৪২, লিনো ৫৮, ৯০+৫)
ভারত – ০
৩ অক্টোবর, ২০২৬
কতটা পথ পেরলে তবে ফুটবলের অভিজাত শ্রেণিতে উত্তরণ ঘটানো যায়?
প্রশ্নটা সহজ, উত্তরও জানা। দুর্গম গিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার পেরতে হয়, ফুটবল মাঠে। কীভাবে, সেটাই আসল। সে জন্য এমন কিছু ম্যাচ খেলতে হয়। বিপক্ষের সঙ্গে যেখানে র্যা্ঙ্কিং-এ ১৩২ ধাপের দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান। চার গোলের ব্যবধান আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্রাজিলের জায়গায় কোনও ইওরোপীয় দল হলে পেশাদারিত্বের চূড়ান্ত নজির দেখিয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করে ফেলত শুরু থেকেই বিনিসিউস, গিমারায়াস এবং মার্তিনেইকে মাঠে রেখে। ব্রাজিল তেমন করেনি।
ভারতের প্রাপ্তি বলতে ব্রাজিলের গোলমুখে পৌঁছনো, সেলেকাওদের গোলকিপারের বার তিনেক ১৮ গজের বক্সের বাইরে বেরিয়ে এসে বল বিপদসীমার বাইরে পাঠাতে বাধ্য হওয়া, গোললাইন সেভ একবার, মনবীর সিং, রায়ান উইলিয়ামসদের তিনকাঠি দেখতে পাওয়া ইত্যাদি। সবই সান্ত্বনাসূচক। একসময় কোচ পিকে ব্যানার্জির কথায় শিরোনাম হত - আমরা হেরেছি কিন্তু খেলেছি দুর্দান্ত! প্রাপ্তি খুঁজে নেওয়ার একমাত্র এবং শেষ পথ।
আসলে, অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে পার্থক্যটা মিটিয়ে ফেলার যদি কোনও রাস্তা থাকে ফুটবলে, যতবার সম্ভব এমন এগিয়ে থাকা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলে যাওয়াই একমাত্র। এই যে ইওরোপে মাঝেমাঝে ছোট ছোট দেশগুলো হারিয়ে দেয় তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকা দেশগুলোকে, প্রধান কারণ নিয়মিত খেলা। বিশ্বকাপ, ইওরোর বাছাইপর্ব এবং এখন নেশনস লিগ, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপে, লামিন ইয়ামালদের বিরুদ্ধে খেলে ফেলে লাটভিয়া-লিথুয়ানিয়া-আর্মেনিয়া। এক-দু’বারের পর নামভীতিটা কেটে যায়, সাত-আটবারে পৌঁছে মনে হয়, আমরাও কিছু করতেই পারি। তখন আর র্যা ঙ্কিংয়ের ব্যবধান দুস্তর হয় না।
গত শতাব্দীর আটের দশকে নেহরু কাপ খেলা হত কলকাতায়। উরুগুয়ে এবং আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে খেলেছিল ভারত। খারাপ তো নয়ই মনে রাখার মতোই খেলেছিলেন ভাস্কর গাঙ্গুলি, প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যরা। কিন্তু প্রসেস বা প্রক্রিয়াটা থেমে যায়। গত চল্লিশ বছরে বারকয়েক কাতার-কুয়েত বা জাপানের বিরুদ্ধে খেলা ছাড়া সেই অর্থে বড় দলের বিরুদ্ধে খেলা হয়ইনি। যুবভারতীতে তো সেই ২০০৪ সালে জিকোর জাপানের বিরুদ্ধে খেলার ২২ বছর পর খেলল ব্রাজিলের বিরুদ্ধে। সেই জাপানের তুলনায়ও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা অভিজাত, নিঃসন্দেহে! তাঁরা তাই প্রচুর পরিবর্তন করল দ্বিতীয়ার্ধের দলে, দেখাদেখি ভারতও। কিন্তু, বিশেষ গা ঘামায়নি ব্রাজিল, মাথা তো নয়ই! এই ম্যাচগুলো তাদের কাছে এমনই, হঠাৎ কখনও গতি বাড়িয়ে বা টানা পনেরটা পাস খেলে গোলমুখ খুলে ফেলার চিরাচরিত রীতি মেনে ঝলক দেখানো - ব্যস!
দুই অর্ধে দু’টো করে, মোট চার গোল খেল ভারত, যার মধ্যে প্রথম তিনটি গোলই উপহার দেওয়া। অধিনায়ক গুরপ্রীত সিং প্রথম দুই গোলের ক্ষেত্রে আরও ভাল কিছু করতে পারতেন হয়তো। শুক্রবারই মারকিনিওস আলাদা করে বলেছিলেন বিপক্ষের অধিনায়কের কথা যিনি ৯০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেললেন বিবেকানন্দ যুবভারতী স্টেডিয়ামে শনিবার। তাঁর ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতা আন্তর্জাতিক স্তরের গোলকিপার হিসাবে ঠিকঠাক। কিন্তু গোলকিপারের উচ্চতা বেশি হলে নীচের দিকে বলে শরীর নামানোর সমস্যা থেকেই যায়। প্রথম পোস্টে গোল খেলেন এস্তেবাওয়ের শটে, পেদ্রোর শটটা সামনে থেকে পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোলে। বেশি কিছু করার ছিল না, সত্যি। কিন্তু আত্মবিশ্বাস টলে গেল বলে খালিদ জামিল দ্বিতীয়ার্ধে তুলেই নিলেন, সুযোগ দিলেন প্রভসুখন গিলকে। ব্রাজিলও কাউকেই বেশি ব্যথা দিল না, পরে গিলকেও জোড়া গোল দিয়ে।
সুতরাং, সরকারি মতে যুবভারতীতে হাজির ৫১ হাজার ৪০২ জন দর্শক পাঁচবারের বিশ্বজয়ীদের কাছে মাত্র চার গোল খাওয়ার ‘আনন্দ’ নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, আসলে দুরু দুরু বুকে। তিন দিন পর এই মাঠেই সামনে দিয়েগো ফোরলানের কোচিংয়ে উরুগুয়ে যাদের শরীরে ব্রাজিলের মতো দয়ামায়া আছে এমন অভিযোগ কস্মিনকালেও ছিল না!
ছবি - এআইএফএফ



No comments:
Post a Comment