কাশীনাথ ভট্টাচার্য / রঙমশালের কিশোরভারতীতে লালহলুদ ইতিহাস
ইন্টার কাশী ১ (আলফ্রেদ ১৫)
ইস্টবেঙ্গল ২ (এজেজারি ৫০, রশিদ ৭৩)
অপেক্ষা মোটেও মধুর
নয়!
লিভারপুলকে জিজ্ঞেস
করুন। ৩০ বছর লেগেছিল! ১৯৮৯-৯০ মরসুমের পর আবার ইংল্যান্ডের জাতীয় লিগ জিততে, ২০১৯-২০
মরসুমে। প্রথম বিভাগীয় লিগ ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার ২৮তম
সংস্করণে এসে প্রথম ট্রফি। পরতে পরতে কত পদস্খলনের স্টিভেন জেরার্ড ইতিহাস!
ইস্টবেঙ্গলকেও
জিজ্ঞেস করতে পারেন। লাল লিভারপুলে জেরার্ড থাকলে লালহলুদে মেহতাব হোসেন ছিলেন, পা
পিছলে যাওয়ার এমন বহু ইতিহাসের সাক্ষী। তাই ২২ বছর লেগে গেল ভারতের জাতীয় লিগ আবার
জিততে। তবে, আইএসএল-এ খেলতে শুরু করার পর ষষ্ঠ সংস্করণে এল খেতাব। আগের পাঁচবারের
পারফরমেন্স? জানতে চাহিয়া লজ্জা দিবেন না প্লিজ! ২০২০-২১ থেকে শুরু করে ৯, ১১, এবং
৯-এর হ্যাটট্রিকের পর, ষষ্ঠ প্রচেষ্টায় চ্যাম্পিয়ন। আর ভারতের সেরা লিগে ২০০৪-এর
পর, যে-কারণে সংবাদমাধ্যমে বাইশ বছরের উল্লেখ চলছিল রোজ। ফিরে আসছিলেন সুভাষ
ভৌমিক, বারবার।
তবেই তো, অপেক্ষা
মধুর না হলেও অপেক্ষার মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়! আর তখন, বাইশ বছর পর দেশের লিগজয়ের দিনের
কি আর ম্যাচ রিপোর্ট হয়? উল্টে মানসপটে ভেসে ওঠেন প্রভসুখন গিল। দিন তিনেক আগে
যিনি এমি মার্তিনেজ হয়ে শেষ মুহূর্তে বাঁ-পা ছড়িয়ে জেমি ম্যাকলারেনের শট আটকে
বাঁচিয়ে রেখেছিলেন লিগজয়ের স্বপ্ন। ১৩ ম্যাচের লিগে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ‘সেভ’,
রূপকথা হয়ে যা ছড়িয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। ‘লাস্ট ল্যাপ’, প্রতিযোগিতার
‘বিজনেস এন্ড’ – এই ইংরেজি শব্দগুলো এখন বেশ প্রচলিত ইপিএল-এর ঢালাও প্রচারের
কল্যাণে। সঙ্গে জুড়ে নিন আমাদের বাংলার কথাও - শেষ ভাল যার, সব ভাল তার। ইস্টবেঙ্গলের
এবার শেষের মতো সবই ভাল!
তা-ও তো পিছিয়ে পড়তে
হয়েছিল ১৫ মিনিটেই। সুনীল গাঙ্গুলি মেনে ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ গোলে। নিজেদের রক্ষণ থেকে
স্পেনীয় দাভিদ উমানেস মুনিওস-এর উঁচু করে তোলা বল ভেসে এসেছিল ইস্টবেঙ্গল রক্ষণে।
আনোয়ার আলি তখন নেটওয়ার্ক সীমানার বাইরে। আরও এক স্পেনীয় আলফ্রেদ প্লানাস মোয়া সেই
বল মাটিতে পড়তে দিলেন না।মাথার ওপর দিয়ে আসা বলেই দুর্দান্ত শটে গিলকে পরাস্ত করে
চুপ করিয়ে দিলেন কিশোরভারতীর গ্যালারি।
সেই গ্যালারি জাগল
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে যখন ইউসেফ এজেজারি বিপক্ষের বাঙালি গোলরক্ষক শুভম দাসের
পায়ের ফাঁক দিয়ে বল নিতে গিয়ে শুভমের পায়ে লাগিয়েও বলচা ফেরত পেলেন নিজের পায়ে এবং
সমতা ফিরিয়ে প্রতিযোগিতার সর্বোচ্চ গোলের (১১) রেকর্ডে নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন।
বাইপাসে খানিক দূরের যুবভারতীতে তখনও সানজিভ গোয়েনকার সুপার জায়েন্ট গোলের মালা
পরানোর স্বপ্নে বুঁদ থাকলেও বাস্তবে গোল পায়নি যেমন, খায়ওনি।
৬২ মিনিটে
যুবভারতীতে যখন আঁধার নেমেছিল দিল্লির কাছে গোল খেয়ে তার মিনিট দশেক পর কিশোরভারতীতে
বাড়তি আলো মহম্মদ রশিদের গোলে। ইংল্যান্ডের তীব্র বর্ণবিদ্বেষী সংবাদমাধ্যম যেমন
নামে ‘মহম্মদ’ এবং বিখ্যাত হলেই তাঁদের ‘মো ফারা’ বা ‘মো সালা’ বানিয়ে দেয়,
মনেপ্রাণে ইংরেজ হতে-চাওয়া বাঙালিও এখন থেকে তাঁকে ‘মো রশিদ’ বলতে শুরু করতেই
পারে। সালা যেভাবে লিভারপুলকে খেতাব জেতাতে ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়, রশিদও তো তেমনই।
মাঝমাঠে ভারসা দিলেন মরসুম জুড়ে, শেষ ম্যাচে জয় এল তাঁরই পা থেকে, বিপিন সিংয়ের
দুরন্ত অ্যাসিস্ট-এ। সেই গোলের আগে কোচ অস্কার ব্রুজোন তুলে নিয়েছিলেন এজেজারিকে।
ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছিলেন এজেজারি। কিন্তু রশিদের গোলের পর মাঠে ঢুকে
জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানিয়ে বেঞ্চে ফিরে যেভাবে কেঁদে ফেললেন, আবারও বোঝা গেল টিমগেমের
সার্থকতা। সতীর্থর গোল যদি কাঁদিয়ে না দেয়, টিমগেম কেন!
তারপর আবারও
অপেক্ষার পালা। বাকি ২৭ মিনিট। সংযুক্ত সময়ের পাঁচ মিনিট আরও। যুবভারতীতে ৮৯
মিনিটে সমতা ফিরিয়েছেন মনবীর সিং। আট মিনিট যুক্ত হয়েছে নব্বইয়ের পর। আট মিনিটে কি
আরও ছ’গোল হতে পারে, সম্ভব? আর্জেন্তিনার গুনে গুনে ছ’গোল দেওয়া পেরুকে, আটাত্তরে,
মনে আছে তো! কিন্তু সে তো আগেভাগে জেনেশুনে ম্যাচ খেলতে নামা, যার বছর আটেক পর
থেকে ফিফা নিয়ম করে দিয়েছিল, লিগে শেষ ম্যাচগুলো একই সময় হবে। বিশেষ করে যখন
প্রতিযোগিতার ফলাফল নির্ধারিত হতে পারে। তাই একই সঙ্গে যুবভারতী-কিশোরভারতীর
পাশাপাশি গুয়াহাটিতে পাঞ্জাব-মুম্বই এবং টাটানগরে জামশেদপুর-ওডিশাও চলছিল, একই
সঙ্গে, একই সময়ে।
৯০ মিনিটে ছ’গোল
হয়নি যখন, আট মিনিটেও হবে না বুঝে গিয়েছিল হাজার আটেক দর্শকের কিশোরভারতী ততক্ষণে।
চাপা টেনশন শুধু, বড় ম্যাচে পাঁচ মিনিটও ব্যবধান ধরে রাখতে না-পারার স্মৃতি। বুক
দুরুদুরু।
রেফারির শেষ বাঁশির পর মাঠদখলের গল্পটাই থেকে গেল। গ্যালারি ভেসে যায় মশালের আলোয়। রঙমশালটা একলা জ্বালে না কেউ। সেই যে লিভারপুলের গানটা আছে না, ‘ইউ’ল নেভার ওয়াক অ্যালোন’, অ্যানফিল্ডে যা জাতীয় সঙ্গীত পর্যায়ে, আজকের পর কিশোরভারতীতেও লালহলুদ সমর্থকরা কাগজের মশাল জ্বালাতে জ্বালাতে, কবীর সুমন গেয়েই যেতেন ‘রঙমশালটা একলা জ্বেলো না, আমার বুকেও জ্বালো’!
ছবি – এআইএফএফ,
আইএসএল
.jpg.jpeg)
.jpg.jpeg)

.jpg.jpeg)
অবশেষে স্বপ্ন পূরণ
ReplyDelete