সুভাষ-স্বপ্না, খিদ্দা-কোনি / কাশীনাথ ভট্টাচার্য
কাশীনাথ ভট্টাচার্য
ছটফটে, দুষ্টু, প্রাণোচ্ছ্বল, প্রগলভ।
শান্ত, শিষ্ট, স্থিতধী, প্রাজ্ঞ।
রসায়নে অদ্ভুত বৈপরীত্য। তাই এত আকর্ষণ। চুম্বকের
উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মতো। সমমেরু বিকর্ষণ, ক্লাস নাইনের ভৌতবিজ্ঞান বলেছিল!
মাস্টারমশাই বলেন যুক্তি সাজিয়ে। বাস্তবানুগ। ‘অলিম্পিকে
কোয়ালিফাই করা যাবে। ৬২০০ পয়েন্ট হলেই। ওর যা পোটেনশিয়াল, আরও ঘষামাজা করলেই সম্ভব।
আমার ধারণা, ৬৪০০ পর্যন্ত যেতেই পারে। কিন্তু, অলিম্পিক পোডিয়াম? ৬৮০০ লাগবে। সেখানেও
কি পৌঁছনো যায় না? অসম্ভব বলে কিছু নেই, হতেই পারে। কাজটা খুব শক্ত।’
![]() |
| স্বপ্না ও তাঁর কোচ সুভাষ সরকার, কলকাতা ক্রীড়া সাংবাদিক তাঁবুতে |
ছাত্রীর অতশত ভাবনা নেই। সঁপে দিয়েছেন নিজেকে। পিতৃসম
গুরুর কাছে। গুরুবাক্য বেদবাক্য। ‘অলিম্পিকে যাওয়ার স্বপ্ন সবাই দেখে, আমিও। অলিম্পিক
পদকের স্বপ্নও দেখে কেউ কেউ। আমি এখনই দেখছি না। অত দূর ভাবছি না। স্যর তো বললেনই।
আমি বলতে পারি শুধু, স্যর যদি স্বপ্ন দেখাতে চান, আমি দেখতে রাজি।’
স্বপ্না বর্মন আর সুভাষ সরকার। বাংলার দুই গর্ব। একসঙ্গে
এসেছিলেন, কলকাতা ক্রীড়া সাংবাদিক তাঁবুতে। বুধবার ভরদুপুরে। সিটি লাইটস স্বপ্নার হাতে
তুলে দিল ৫১ হাজার টাকার চেক। সাংবাদিক সম্মেলনে থিকথিকে ভিড়। হাতের এত কাছে এশিয়ান
গেমসে সোনাজয়ী। হেপ্টাথলনে, অ্যাথলিট মেয়েদের যা কঠিনতম। ট্র্যাকে ১০০ মিটার হার্ডলস,
২০০ মিটার ও ৮০০ মিটার। ফিল্ডে হাই জাম্প, লং জাম্প, শটপাট ও জ্যাভেলিন থ্রো। খেলতে
লাগে দুটোদিন। প্রস্তুতিতে কত, কে রাখে খবর!
প্রস্তুতিরও
তো কত রকমসকম। বিদেশে গিয়ে নেবেন কোচিং? স্বপ্না জানালেন, প্রস্তাব আসছে। তবে,
কোচকে ছাড়া যাবেন না, বুঝিয়েই দিলেন। কোচের ভাবনা কোচের মতোই। ‘স্প্রিন্টটা ওর
সমস্যা। অথচ, স্প্রিন্টের দুটো ইভেন্ট আছে, লং জাম্পেও স্প্রিন্ট জরুরি। মানে,
দৌড়টা ভাল হলে লং জাম্পেও উন্নতি হতে পারে। তাই কথা বলছি, বিদেশে কোনও স্প্রিন্ট-এক্সপার্টের
কাছে যদি যাওয়া যায়, কিছু দিনের জন্য। হেপ্টাথলনের জন্য চাই না শুধু স্প্রিন্ট
কোচ। শুনেছি, বেঙ্গালুরুতে নাকি কোনও এক সংস্থায় এমন ব্যবস্থা আছে। সব ঠিকঠাক হলে
যেতেও পারি। স্প্রিন্টে উন্নতি করতে পারলে ওর টোটাল পয়েন্ট বেড়ে যাবে অনেক।’
মাস্টারমশাই
যখন এসব বলছেন, ঠাণ্ডা জলের বোতলটা হাতে তুলে গালে বোলাচ্ছিলেন ছাত্রী। পরে জানা
গেল, যে দাঁত-দুটো সবচেয়ে বেশি ঝামেলায় ফেলেছিল এশিয়ান গেমসের সময়, তুলে এসেছেন
সকালেই। যন্ত্রণামুক্তির ঠাণ্ডা প্রলেপ। কখনও বা মাথা নিচু করে চুলগুলো আনছিলেন
সামনে। ছটফটানি একুশের। এক জায়গায় এতক্ষণ বসে-থাকা, উফ্! এত প্রশ্ন-টশ্নই বা কেন
বাপু! দুবার ১০০-র হার্ডলসটা টেনে আসি, চলুন স্যর!
ক্রীড়া সাংবাদিকদের আয়োজন।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই চমক। এসেছিলেন সরস্বতী সাহা, ২০০২ এশিয়াডে ২০০ মিটারে সোনাজয়ী।
১৬ বছর পর এশিয়াড থেকে সোনা আবার বাংলায়। তাই ১৬ গোলাপের শুভেচ্ছা, সরস্বতীর তরফে
স্বপ্নাকে। মোবাইলে ধরে ফেলা হল দীপা কর্মকারকেও। আগরতলায় কোনও এক পাহাড়ে তখন রিও
অলিম্পিকের চতুর্থ স্থানাধিকারী জিমন্যাস্ট, প্রোদুনোভা ভল্টের কারণে যিনি ‘দীপানোভা’।
‘খুব খুশি তোমার সাফল্যে। আরও ভাল করো, সামনে অলিম্পিক। তোমাকে সফল দেখতে চাই,’
দীপার কথা। ‘তোমাকেও তো চাই অলিম্পিকে। তুমিও খুব ভাল করো। খুব ভাল লাগল তোমার ফোন
পেয়ে। ভাল থেকো,’ স্বপ্নার প্রত্যুত্তর। অন্য আবেগ।
কোচের কিন্তু জমিতে পা। ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ?
যাব কিনা ঠিক নেই। ২০১৯-এর সেপ্টেম্বর। বছরখানেক হাতে। যাব না, বলছি না। কিন্তু
অনেক কিছু ভাবতে হবে। সবার আগে ভাবনা, সব চোট থেকে মুক্তি। এই সময়টায় আমাদের কথা
শুধু ডাক্তারদের সঙ্গে। মুম্বইতে অনন্ত যোশিসহ অন্য ডাক্তারদের সঙ্গেও কথা বলছি।
পুরোপুরি চোট না সারলে কোনওভাবেই উন্নতি হবে না। সময় আছে হাতে যখন, চোট সারানোই
প্রধান কাজ। পুরোপুরি ট্রেনিং তারপর। চাই না তাড়াহুড়োয় চোট বাড়ুক।’
কিন্তু, তা হলেও, বিশ্ব প্রতিযোগিতা
নিয়ে ভাবনা নেই? ‘তিনটে বড় প্রতিযোগিতা সামনের বছর। ন্যাশনালস তো আছেই, সঙ্গে এশীয়
এবং বিশ্ব প্রতিযোগিতা। আমি আরও এগিয়ে ভাবতে চাইছি। ২০২০-র অলিম্পিক তো বটেই, ২০২২
এশিয়ান গেমস। একই ইভেন্টে পরপর দুটো এশিয়াডে কোনও ভারতীয় অ্যাথলিট কি সোনা পেয়েছে
কখনও? চাই, স্বপ্না সেই স্বপ্নটাও পূরণ করুক। তাই টুর্নামেন্ট বাছাই জরুরি।’
স্বপ্নার তখন কপট অনুযোগ! ‘ডায়েট
একটা আছে আমার। মোটামুটি মানিই না। কিন্তু মিষ্টি খেতে দেয় না স্যর। এখন তো কয়েকটা
দিন খেয়ে নিই, বলুন। আবার ট্রেনিং শুরু হলেই তো, ব্যস্!’ দিনে কতবার ঝগড়া করেন
স্যরের সঙ্গে? শেষ কবে ঝগড়া হয়েছিল? হেসে লুটোপুটি প্রায়, সদ্য-সোনাজয়ী। কিন্তু,
সমর্পিত। স্যর যা বলবেন, শুনতেই হবে। মাঠে হোক বা বাইরে। স্যরের পছন্দ নয়, তাই
চাকরিও নেননি এখনও। স্যার বলছেন, আরও ভাল চাকরির সন্ধান পেলে, তবেই।
‘টাকাপয়সা নিয়ে এত ভাবনা এখন নেই আর।
টপ-এ (টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম) আছে। মাসে ৫০ হাজার পায়। স্পনসর আছে, গো
স্পোর্টস। একটু ভাল চাকরি চাইছি, ওরই জন্য। আর, অনেককেই দেখেছি, শুধু চাকরির
কারণেই যেন আসে খেলতে। চাকরিটা যে-ই হয়ে গেল বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড জুটে গেল,
বিয়েটিয়ে করে সংসারি। খেলা তখন আর কোনও তালিকাতেই থাকে না।’
ছাত্রীও সরব, ‘আমি কিন্তু বিয়েটিয়ের
কথা ভাবিইনি এখনও!’ নিজের ছবির পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে ব্যস্ত তাঁকে দেখে কে বলবে, এশিয়াডে সোনাজয়ী মেয়ে!
স্বপ্না জানালেন, পরিচালক সৃজিত
মুখার্জির ফোন এসেছিল জাকার্তায়, সোনা জেতার পর। ‘বলেছিলেন, আমার আপত্তি না থাকলে
বায়োপিক ধরনের ছবি করতে চান। আমার আবার কীসের আপত্তি! মিলখা সিংকে নিয়ে ছবিটা
দেখেছিলাম। তখনই তো ভেবেছিলাম, আমাকে নিয়েও কেউ যদি এমন ছবি করে, মন্দ কী?’ বলেই
হঠাৎ বোধহয় মনে হল, পাশে কোচ আছেন। আড়চোখে চেয়ে নিলেন। ‘স্যর কী বলবেন, জানি না।
শুধু এটুকু জানি যে, আমার ভূমিকায় যিনি অভিনয় করবেন, খুব খাটনি হবে কিন্তু!’ তাঁকে
ডাকলে, ছোট ভূমিকায়? ‘করে ফেলব, আমার কোনও আপত্তিই নেই।’
পাশে-বসা স্যারের ঠোঁটের কোণে
একচিলতে হাসি। ধরে নেওয়াই যায় মনে মনে বলছিলেন, ‘বলে যা, প্রাণে যা চায়। ট্র্যাকে
নাম্ একবার। হেপ্টার ট্রেনিং তো জানিসই কেমন। আরও বুঝিয়ে দেব এবার!’ খিদ্দা-কোনির
গল্পের মতো। জল থেকে উঠতে দেব না, খিদ্দার খবরদারি। হাত ছিড়ে যাচ্ছে খিদ্দা,
এবারটি ছেড়ে দাও, কোনির আর্তি। খিদ্দা আরও দুটো পঞ্চাশ-পঞ্চাশ টানিয়ে নিচ্ছেন। পরে,
হা-ক্লান্ত কোনি জল থেকে উঠে ঘুমিয়ে কাদা যখন, পরম মমতায় মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে
দেবেন বাবা।
সে-গল্পই কল্পনায় দেখা, আবার!


No comments