বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ৪/ লিওনিদাস, বিশ্বকাপে ব্রাজিল–যুগ শুরু / কাশীনাথ ভট্টাচার্য
উরুগুয়ের পর এবার আর্জেন্তিনার পালা!
ইউরোপ জুড়ে শুরু সমস্যা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দোরগোড়ায়। টালমাটাল অবস্থা। তবু ফিফার ১৯৩৬ কংগ্রেস বার্লিনের অপেরা হলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর্জেন্তিনায় নয়,ফ্রান্সে হবে ১৯৩৮ বিশ্বকাপ। আর্জেন্তিনীয়দের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও। ক্ষুব্ধ আর্জেন্তিনীয় ফুটবল সংস্থা সিদ্ধান্ত নেয়, ফ্রান্সে যাবে না বিশ্বকাপ খেলতে।
কিন্তু, উরুগুয়েতে যেমন জনসমর্থন সঙ্গে ছিল উরুগুয়ে ফুটবল সংস্থার, ১৯৩৪ বিশ্বকাপ বয়কটের প্রশ্নে, আর্জেন্তিনার ফুটবল সংস্থা সেই সমর্থন পায়নি। উরুগুয়েতে ফুটবল সংস্থার কর্মকর্তারা প্রতীকী প্রতিবাদকে দেশের সম্মানের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। ‘যে সব ইউরোপীয় দেশ উরুগুয়ের স্বাধীনতা উদ্যাপনের শতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে আসেনি, তাদের দেশে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আমাদেরও দায় নেই, সে আমরা আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হলেই বা’, উরুগুয়ে ফুটবল সংস্থার এই কথায় দেশের সাধারণ ফুটবলপ্রেমী মানুষের সমর্থন ছিল। আর্জেন্তিনার যুক্তিতে শুধুই অভিমান। তাই, ব্রায়ান গ্ল্যানভিল লিখেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের (আর্জেন্তিনার) বুয়েনোস আইরেস ফুটবল সংস্থার অফিসের সামনে বিক্ষোভ হয়, ভাঙচুরও, পুলিশ ডেকে শেষ পর্যন্ত কোনওরকমে অবস্থা সামাল দেওয়া হয়েছিল।’
আবার নক আউট, ইংল্যান্ড তখনও নেই, উরুগুয়ে আসতে পারেনি দেশে পেশাদারিত্বের প্রচলন নিয়ে উদ্ভুত সমস্যায় ঠিকঠাক দল গড়তে না–পারায়। বাকি দেশগুলি ছিল। ৩৪–এর রানার্স চেকোস্লোভাকিয়া, স্পেন, সুইডেন, রোমানিয়া, সুইটজারল্যান্ড, আয়োজক ফ্রান্স। এবং, অবশ্যই গতবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি, সেই পোজোর প্রশিক্ষণে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দ্বিতীয়বার বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। তবে, এবার আর ভাড়াটে সৈন্যদের নিয়ে নয়। সত্যি কথায়, ইতালির ১৯৩৮ দলে দক্ষিণ আমেরিকার একজনই। উরুগুয়ের মিচেল আন্দ্রেওলো, আর্জেন্তিনার মন্তির জায়গায়।
প্রথম পর্ব
মুসোলিনির পথ ধরে হাঁটতে চেয়েছিলেন অ্যাডলফ হিটলারও। দখল নিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার। ১২ এপ্রিল, অস্ট্রিয়ার ফুটবল সংস্থা উঠে যাওয়ার ঘোষণা। বিশ্বকাপে তাদের জায়গায় ইংল্যান্ডকে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যা ইংরেজরা স্বভাবসিদ্ধ ব্রিটিশ গরিমায় গ্রহণ করেনি। কিন্তু, হিটলারের দেশের তাতে কী? সেপ হার্বারজার নয় নয় করে ন’জন অস্ট্রীয়কে রেখেছিলেন তাঁর বিশ্বকাপ দলে। তাঁদের প্রথম পাঁচ জন — র্যাফটল, মোক, হ্যানেম্যান, স্কুমাস এবং পেসার খেলেছিলেন প্রথম ম্যাচে সুইটজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে, রিপ্লেতে আরও তিন জন, স্কুমাল, স্ট্রো ও নিউমার। কিন্তু, সুইসরা তখন বড় শক্তি। কাতানেচিও–র প্রাথমিক সংস্করণ তখনই তাঁদের খেলায়, বছর ২০–র মধ্যেই সুইসবোল্ট আসছে, ইংল্যান্ডকে ২–১ হারিয়েছে বিশ্বকাপের কিছুদিন আগেই। প্রথম ম্যাচ অতিরিক্ত সময়েও ১–১ হওয়ায় পাঁচ দিন পর রিপ্লেতে তাঁরা হিটলারের জার্মানিকে হারিয়ে দেয় ৪–২, প্রথমে ০–২ পিছিয়ে পড়েও। আসলে, হার্বারজারের হাতে কোনও সুইপার (পড়ুন বেকেনবাওয়ার!) ছিল না তখন। মুসোলিনিকে ছোঁয়ার হিটলারি প্রচেষ্টা তাই অসফল।
মধ্য আমেরিকার প্রথম চমক এই বিশ্বকাপে কিউবা। মেহিকোর কাছে বারবার হারায় প্রথম দুই বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি, মূলপর্বে এসেই চমকে দেয় রোমানিয়াকে হারিয়ে। প্রথম দিনই নজর কেড়ে নিয়েছিলেন সোকোরো, দুগোল করে। ৩–৩, ফলে রিপ্লে এবং কিউবা ২, রোমানিয়া ১, কিউবা কোয়ার্টার ফাইনালে!
উরুগুয়ে, আর্জেন্তিনার অনুপস্থিতিতে দক্ষিণ আমেরিকার দায়িত্ব একা ব্রাজিলের ঘাড়ে এবং লিওনিদাসকে পেয়ে ব্রাজিল সেমিফাইনাল পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। স্বাভাবিক লাবণ্যে নয়। তাঁদের খেলায় কখনও বল–শিল্পের সেই প্রদর্শনী যা তাঁদের ব্রাজিল করেছে, কখনও বা নিখাদ মারামারি করেও, যা তাঁদের স্বভাববিরুদ্ধ।
ব্রাজিল–পোল্যান্ড প্রথম ম্যাচের জন্য অবশ্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। ফল? ৬–৫, এবং টাইব্রেকার তখনও আসেনি! প্রথমার্ধে ব্রাজিল এগিয়ে ৩–১, ৯০ মিনিট শেষে ৪–৪। লিওনিদাসের তিন গোলের জবাবে পোলিশ আর্নেস্ট উইলিমোস্কির চার গোল। বিশ্বকাপের মূলপর্বে সেই প্রথম কোনও ম্যাচে কারও চার গোল একারই। লিওনিদাস পরে জানিয়েছিলেন, মাঠে এত কাদা ছিল যে তাঁর বুটের সোল খুলে গিয়েছিল। রেকর্ড বলছে, মাঠ থেকে বুট খুলে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সাইড লাইনের দিকে,জনতা ‘খেয়েছিল’ সেই স্টান্ট। কিন্তু, সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ড ওসবে ভোলেননি, বাধ্য করিয়েছিলেন লিওনিদাসকে আবার বুট পরতে।
সমস্যায় পড়েছিল ইতালি আবারও। অদ্ভুত হলেও সত্যি, চারবার ইতালি বিশ্বকাপ জিতেছে, তার মধ্যে তিনবারই প্রথম রাউন্ড টপকাতে জিভ বেরিয়ে গেছে। ৩৪–এর পর ৩৮–এ এবার নরওয়ের কাছে। প্রথমে এগিয়ে গেলেও গোটা ম্যাচে প্রাধান্য ছিল নরওয়েরই। অতিরিক্ত সময়ে পিওলা ওই একবারই এরিকসনের মার্কিং ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন বলে কোনওরকমে বেরিয়ে যায় গতবারের চ্যাম্পিয়নরা।
কোয়ার্টার ফাইনাল
গ্ল্যানভিলের বই থেকে পরিষ্কার ‘টুকে’ দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না, কী অদ্ভুত ব্যাপ্তি এই ছোট্ট উদ্ধৃতির!
সুইডেনের সঙ্গে প্রথম রাউন্ডে খেলা ছিল অস্ট্রিয়ার। কিন্তু, অস্ট্রিয়ার ফুটবল সংস্থাই নেই, দল পাঠাবে কী করে? তাই ‘বাই’ পেয়ে শেষ আটে পৌঁছন সুইডেন প্রথম ম্যাচে কিউবাকে হারিয়ে দিল ৮–০! বিশ্বকাপের প্রথম অঘটন যাদের, কোয়ার্টার ফাইনালে একেবারে ‘নো–ম্যাচ’ হয়ে যাওয়ার রূঢ় বাস্তব তাঁদের নামিয়ে এনেছিল মাটিতেও। ওই ম্যাচেই, পাঁচ গোল দেখার পর ষষ্ঠ গোল হতে দেখে টাইপরাইটার বন্ধ করতে করতে ওই অমর উক্তি এমানুয়েলের — ৫ গোল পর্যন্ত সাংবাদিকতা,পরেরটা পরিসংখ্যান!
ব্রাজিল–চেকোস্লোভাকিয়া ম্যাচে মারামারির ইতিহাস। চেকদের দুই সেরা ফুটবলার প্লানিকার হাত ভাঙে, নেইয়েডলির পা। ১–১, কিন্তু, রিপ্লে ম্যাচের আগে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল ব্রাজিল শিবির যে, বেশিরভাগ প্রথম দলের ফুটবলারই চলে গিয়েছিলেন ইতালির বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল খেলতে, মার্সেই–তে, আগেই! লিওনিদাস তো আছেন, চিন্তা নেই ভেবে। এবং লিওনিদাস নিরাশ করেননি, রিপ্লেতেও প্রথম গোল তাঁর পা থেকেই।
ইতালির কাছে ফ্রান্সের ৩–১ হার অসম্ভব নয়, বিশেষত পিওলাকে ছেড়ে রাখার সিদ্ধান্ত যেহেতু নিয়েছিলেন ফরাসি কোচ। জার্মানিকে হারিয়ে সুইসরাও ক্লান্ত, হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। হাঙ্গেরির ২–০ জিততে আদৌ অসুবিধে হয়নি।
সেমিফাইনাল
জেনগেলার–সারোসি, হাঙ্গেরির পুসকাস–হিদেকুতি–ককসিস জমানার আগে বিশ্ব–কাঁপানো জুটি। ক্রিস ফ্রেডির বই জানাচ্ছে, ৭৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচে এই জুড়ির গোল সংখ্যা ১০০! সুইডেনের কাছে এই জুটিকে আটকে রাখার কোনও অস্ত্র ছিল না। ফলে ১–৫ হার।
কিন্তু, ব্রাজিল তা–ই করে যা ব্রাজিলের পক্ষেই সম্ভব। লিওনিদাসকে এই ম্যাচে প্রথম এগারয় রাখেননি কোচ আধেমার পিমেন্তা। কেন, কী বুঝে, কেউ জানে না। পরে কারণ অবশ্য দেখানো হয়েছিল যে, চেকদের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে পরপর দুই ম্যাচ খেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন লিওনিদাস, তাই বিশ্রাম (!) দেওয়া হয়েছিল তাঁকে, ফাইনালের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু, বিশ্বকাপের আসরে এত বড় ভুল আর কোনও কোচ কখনও করেছেন কিনা, গবেষণার বিষয়। ইতালি ২–১ জিতে ফাইনালে। মজার ব্যাপার, সেমিফাইনালের আগেই ব্রাজিলের গোটা দলের মার্সেই থেকে পারি (Paris) যাওয়ার বিমানের টিকিট কেটে ফেলা হয়েছিল। হারলে, তৃতীয় স্থানের জন্য খেলা আবার ছিল বোরদ্যঁ–তে। খেলার আগে ব্রাজিলের পারি যাত্রার টিকিটের খবর পেয়ে পোজো নাকি গিয়েছিলেন সেই খবরের সত্যতা জানতে, ব্রাজিল শিবিরে। এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল শিবির যে, বলা হয়েছিল, হারার কোনও সম্ভাবনাই নেই। পোজো তবুও বলে এসেছিলেন, ‘যদি হারো, যেতে হবে বোরদ্যঁ–তে, তখন কিন্তু আমরাই যাব পারি–তে।’ আর সেই আত্মবিশ্বাসে বা আত্মতুষ্টিতে, প্রথম এগারর আটজনকে বাদ দিয়ে সেমিফাইনাল খেলতে নেমে পড়েছিল ব্রাজিল!
তৃতীয় স্থানের খেলায় লিওনিদাস অধিনায়ক এবং ব্রাজিল ০–২ পিছিয়ে পড়ে ৪–২ জয়ী সুইডেনের বিরুদ্ধে, লিওনিদাসের দুগোল, প্রতিযোগিতায় মোট আট।
আজ এমন হলে? ব্রাজিল কোচের কোর্ট মার্শাল হয়ে যেতেই পারত!
[caption id="attachment_4236" align="aligncenter" width="800"]
টানা দুবার বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র কোচ ইতালির ভিত্তোরিও পোজো[/caption]
ফাইনাল
বিশ্বজয়ীদের নিয়ে সামান্য হলেও কথা উঠেছিল। পোজোর পছন্দ না হওয়াই স্বাভাবিক। তাই দল গড়েছিলেন নতুনদের নিয়ে। পুরনোদের মধ্যে ফেরারি, মেয়াজারা ছিলেন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে। আর ছিল শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে বুঝিয়ে দেওয়ার রোখ, চ্যাম্পিয়নদের যা সহজাত।
উল্টোদিকের দলে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার অতি–উৎসাহ, যার নিটফল ৬ মিনিটের মধ্যে গোল খাওয়া। সে সময় হাঙ্গেরির দুজনের বেশি ফুটবলার নিজেদের অর্ধে ছিলেন না। একেবারে ফাঁকায় কোলাউসিকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন বিয়াভাতি। কিন্তু, এক মিনিটের মধ্যেই সারোসির পা থেকে বেরল তিতকোসের জন্য বল, গোল না করাও কঠিন সেখানে।
ইতালি অবশ্য খেলার নিয়ন্ত্রণ আর হারায়নি। গায়েগতরে খেলতে ইতালির খুব বেশি কষ্ট কখনও তেমন করতে হয়নি, খালি প্রয়োজনটা বুঝতে পারলেই হল। সারোসি আবার একটু গা–বাঁচিয়ে খেলার লোক। হাঙ্গেরির সমস্যা বাড়ল তাতে। পিওলা, লোকাতেলি, বিয়াভাতি, মেয়াজাদের দখলে মাঝমাঠ, হাঙ্গেরীয়রা সুবিধে করে দিচ্ছিল ঘর ফাঁকা রেখে আক্রমণে উঠে। ৩৫ মিনিটে ৩–১, সারোসি যখন ব্যবধান কমালেন, ম্যাচে তখন ইতালীয়দের দাপট, শেষে ৮২ মিনিটে পিওলার দ্বিতীয় গোল এবং ইতালীয়দের কান্নায় ভেঙে পড়া ম্যাচ শেষে।
পোজো দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিথর। আজ পর্যন্ত আর হয়নি কখনও এমন। একই কোচের পরপর দুবার বিশ্বকাপ জয়, খেতাব ধরে রাখা, এখন তো অভাবনীয়।
তারপর? গ্ল্যানভিল যেমন লিখেছেন, ‘আগামী ১২ বছর আর কোনও বিশ্বকাপ নেই’!
(আগামিকাল ১৯৫০ ব্রাজিল)
ইউরোপ জুড়ে শুরু সমস্যা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দোরগোড়ায়। টালমাটাল অবস্থা। তবু ফিফার ১৯৩৬ কংগ্রেস বার্লিনের অপেরা হলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর্জেন্তিনায় নয়,ফ্রান্সে হবে ১৯৩৮ বিশ্বকাপ। আর্জেন্তিনীয়দের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও। ক্ষুব্ধ আর্জেন্তিনীয় ফুটবল সংস্থা সিদ্ধান্ত নেয়, ফ্রান্সে যাবে না বিশ্বকাপ খেলতে।
কিন্তু, উরুগুয়েতে যেমন জনসমর্থন সঙ্গে ছিল উরুগুয়ে ফুটবল সংস্থার, ১৯৩৪ বিশ্বকাপ বয়কটের প্রশ্নে, আর্জেন্তিনার ফুটবল সংস্থা সেই সমর্থন পায়নি। উরুগুয়েতে ফুটবল সংস্থার কর্মকর্তারা প্রতীকী প্রতিবাদকে দেশের সম্মানের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। ‘যে সব ইউরোপীয় দেশ উরুগুয়ের স্বাধীনতা উদ্যাপনের শতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে আসেনি, তাদের দেশে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আমাদেরও দায় নেই, সে আমরা আগের বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হলেই বা’, উরুগুয়ে ফুটবল সংস্থার এই কথায় দেশের সাধারণ ফুটবলপ্রেমী মানুষের সমর্থন ছিল। আর্জেন্তিনার যুক্তিতে শুধুই অভিমান। তাই, ব্রায়ান গ্ল্যানভিল লিখেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের (আর্জেন্তিনার) বুয়েনোস আইরেস ফুটবল সংস্থার অফিসের সামনে বিক্ষোভ হয়, ভাঙচুরও, পুলিশ ডেকে শেষ পর্যন্ত কোনওরকমে অবস্থা সামাল দেওয়া হয়েছিল।’
আবার নক আউট, ইংল্যান্ড তখনও নেই, উরুগুয়ে আসতে পারেনি দেশে পেশাদারিত্বের প্রচলন নিয়ে উদ্ভুত সমস্যায় ঠিকঠাক দল গড়তে না–পারায়। বাকি দেশগুলি ছিল। ৩৪–এর রানার্স চেকোস্লোভাকিয়া, স্পেন, সুইডেন, রোমানিয়া, সুইটজারল্যান্ড, আয়োজক ফ্রান্স। এবং, অবশ্যই গতবারের চ্যাম্পিয়ন ইতালি, সেই পোজোর প্রশিক্ষণে, নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দ্বিতীয়বার বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। তবে, এবার আর ভাড়াটে সৈন্যদের নিয়ে নয়। সত্যি কথায়, ইতালির ১৯৩৮ দলে দক্ষিণ আমেরিকার একজনই। উরুগুয়ের মিচেল আন্দ্রেওলো, আর্জেন্তিনার মন্তির জায়গায়।
প্রথম পর্ব
মুসোলিনির পথ ধরে হাঁটতে চেয়েছিলেন অ্যাডলফ হিটলারও। দখল নিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার। ১২ এপ্রিল, অস্ট্রিয়ার ফুটবল সংস্থা উঠে যাওয়ার ঘোষণা। বিশ্বকাপে তাদের জায়গায় ইংল্যান্ডকে খেলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যা ইংরেজরা স্বভাবসিদ্ধ ব্রিটিশ গরিমায় গ্রহণ করেনি। কিন্তু, হিটলারের দেশের তাতে কী? সেপ হার্বারজার নয় নয় করে ন’জন অস্ট্রীয়কে রেখেছিলেন তাঁর বিশ্বকাপ দলে। তাঁদের প্রথম পাঁচ জন — র্যাফটল, মোক, হ্যানেম্যান, স্কুমাস এবং পেসার খেলেছিলেন প্রথম ম্যাচে সুইটজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে, রিপ্লেতে আরও তিন জন, স্কুমাল, স্ট্রো ও নিউমার। কিন্তু, সুইসরা তখন বড় শক্তি। কাতানেচিও–র প্রাথমিক সংস্করণ তখনই তাঁদের খেলায়, বছর ২০–র মধ্যেই সুইসবোল্ট আসছে, ইংল্যান্ডকে ২–১ হারিয়েছে বিশ্বকাপের কিছুদিন আগেই। প্রথম ম্যাচ অতিরিক্ত সময়েও ১–১ হওয়ায় পাঁচ দিন পর রিপ্লেতে তাঁরা হিটলারের জার্মানিকে হারিয়ে দেয় ৪–২, প্রথমে ০–২ পিছিয়ে পড়েও। আসলে, হার্বারজারের হাতে কোনও সুইপার (পড়ুন বেকেনবাওয়ার!) ছিল না তখন। মুসোলিনিকে ছোঁয়ার হিটলারি প্রচেষ্টা তাই অসফল।
মধ্য আমেরিকার প্রথম চমক এই বিশ্বকাপে কিউবা। মেহিকোর কাছে বারবার হারায় প্রথম দুই বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি, মূলপর্বে এসেই চমকে দেয় রোমানিয়াকে হারিয়ে। প্রথম দিনই নজর কেড়ে নিয়েছিলেন সোকোরো, দুগোল করে। ৩–৩, ফলে রিপ্লে এবং কিউবা ২, রোমানিয়া ১, কিউবা কোয়ার্টার ফাইনালে!
উরুগুয়ে, আর্জেন্তিনার অনুপস্থিতিতে দক্ষিণ আমেরিকার দায়িত্ব একা ব্রাজিলের ঘাড়ে এবং লিওনিদাসকে পেয়ে ব্রাজিল সেমিফাইনাল পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। স্বাভাবিক লাবণ্যে নয়। তাঁদের খেলায় কখনও বল–শিল্পের সেই প্রদর্শনী যা তাঁদের ব্রাজিল করেছে, কখনও বা নিখাদ মারামারি করেও, যা তাঁদের স্বভাববিরুদ্ধ।
ব্রাজিল–পোল্যান্ড প্রথম ম্যাচের জন্য অবশ্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। ফল? ৬–৫, এবং টাইব্রেকার তখনও আসেনি! প্রথমার্ধে ব্রাজিল এগিয়ে ৩–১, ৯০ মিনিট শেষে ৪–৪। লিওনিদাসের তিন গোলের জবাবে পোলিশ আর্নেস্ট উইলিমোস্কির চার গোল। বিশ্বকাপের মূলপর্বে সেই প্রথম কোনও ম্যাচে কারও চার গোল একারই। লিওনিদাস পরে জানিয়েছিলেন, মাঠে এত কাদা ছিল যে তাঁর বুটের সোল খুলে গিয়েছিল। রেকর্ড বলছে, মাঠ থেকে বুট খুলে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সাইড লাইনের দিকে,জনতা ‘খেয়েছিল’ সেই স্টান্ট। কিন্তু, সুইডিশ রেফারি ইভান একলিন্ড ওসবে ভোলেননি, বাধ্য করিয়েছিলেন লিওনিদাসকে আবার বুট পরতে।
সমস্যায় পড়েছিল ইতালি আবারও। অদ্ভুত হলেও সত্যি, চারবার ইতালি বিশ্বকাপ জিতেছে, তার মধ্যে তিনবারই প্রথম রাউন্ড টপকাতে জিভ বেরিয়ে গেছে। ৩৪–এর পর ৩৮–এ এবার নরওয়ের কাছে। প্রথমে এগিয়ে গেলেও গোটা ম্যাচে প্রাধান্য ছিল নরওয়েরই। অতিরিক্ত সময়ে পিওলা ওই একবারই এরিকসনের মার্কিং ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন বলে কোনওরকমে বেরিয়ে যায় গতবারের চ্যাম্পিয়নরা।
কোয়ার্টার ফাইনাল
Up to five goals is journalism. After that it becomes statistics.
- Emmanuel Gambardella, French Journalist
গ্ল্যানভিলের বই থেকে পরিষ্কার ‘টুকে’ দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না, কী অদ্ভুত ব্যাপ্তি এই ছোট্ট উদ্ধৃতির!
সুইডেনের সঙ্গে প্রথম রাউন্ডে খেলা ছিল অস্ট্রিয়ার। কিন্তু, অস্ট্রিয়ার ফুটবল সংস্থাই নেই, দল পাঠাবে কী করে? তাই ‘বাই’ পেয়ে শেষ আটে পৌঁছন সুইডেন প্রথম ম্যাচে কিউবাকে হারিয়ে দিল ৮–০! বিশ্বকাপের প্রথম অঘটন যাদের, কোয়ার্টার ফাইনালে একেবারে ‘নো–ম্যাচ’ হয়ে যাওয়ার রূঢ় বাস্তব তাঁদের নামিয়ে এনেছিল মাটিতেও। ওই ম্যাচেই, পাঁচ গোল দেখার পর ষষ্ঠ গোল হতে দেখে টাইপরাইটার বন্ধ করতে করতে ওই অমর উক্তি এমানুয়েলের — ৫ গোল পর্যন্ত সাংবাদিকতা,পরেরটা পরিসংখ্যান!
ব্রাজিল–চেকোস্লোভাকিয়া ম্যাচে মারামারির ইতিহাস। চেকদের দুই সেরা ফুটবলার প্লানিকার হাত ভাঙে, নেইয়েডলির পা। ১–১, কিন্তু, রিপ্লে ম্যাচের আগে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল ব্রাজিল শিবির যে, বেশিরভাগ প্রথম দলের ফুটবলারই চলে গিয়েছিলেন ইতালির বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল খেলতে, মার্সেই–তে, আগেই! লিওনিদাস তো আছেন, চিন্তা নেই ভেবে। এবং লিওনিদাস নিরাশ করেননি, রিপ্লেতেও প্রথম গোল তাঁর পা থেকেই।
ইতালির কাছে ফ্রান্সের ৩–১ হার অসম্ভব নয়, বিশেষত পিওলাকে ছেড়ে রাখার সিদ্ধান্ত যেহেতু নিয়েছিলেন ফরাসি কোচ। জার্মানিকে হারিয়ে সুইসরাও ক্লান্ত, হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। হাঙ্গেরির ২–০ জিততে আদৌ অসুবিধে হয়নি।
সেমিফাইনাল
জেনগেলার–সারোসি, হাঙ্গেরির পুসকাস–হিদেকুতি–ককসিস জমানার আগে বিশ্ব–কাঁপানো জুটি। ক্রিস ফ্রেডির বই জানাচ্ছে, ৭৪ আন্তর্জাতিক ম্যাচে এই জুড়ির গোল সংখ্যা ১০০! সুইডেনের কাছে এই জুটিকে আটকে রাখার কোনও অস্ত্র ছিল না। ফলে ১–৫ হার।
কিন্তু, ব্রাজিল তা–ই করে যা ব্রাজিলের পক্ষেই সম্ভব। লিওনিদাসকে এই ম্যাচে প্রথম এগারয় রাখেননি কোচ আধেমার পিমেন্তা। কেন, কী বুঝে, কেউ জানে না। পরে কারণ অবশ্য দেখানো হয়েছিল যে, চেকদের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে পরপর দুই ম্যাচ খেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন লিওনিদাস, তাই বিশ্রাম (!) দেওয়া হয়েছিল তাঁকে, ফাইনালের কথা মাথায় রেখে। কিন্তু, বিশ্বকাপের আসরে এত বড় ভুল আর কোনও কোচ কখনও করেছেন কিনা, গবেষণার বিষয়। ইতালি ২–১ জিতে ফাইনালে। মজার ব্যাপার, সেমিফাইনালের আগেই ব্রাজিলের গোটা দলের মার্সেই থেকে পারি (Paris) যাওয়ার বিমানের টিকিট কেটে ফেলা হয়েছিল। হারলে, তৃতীয় স্থানের জন্য খেলা আবার ছিল বোরদ্যঁ–তে। খেলার আগে ব্রাজিলের পারি যাত্রার টিকিটের খবর পেয়ে পোজো নাকি গিয়েছিলেন সেই খবরের সত্যতা জানতে, ব্রাজিল শিবিরে। এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল শিবির যে, বলা হয়েছিল, হারার কোনও সম্ভাবনাই নেই। পোজো তবুও বলে এসেছিলেন, ‘যদি হারো, যেতে হবে বোরদ্যঁ–তে, তখন কিন্তু আমরাই যাব পারি–তে।’ আর সেই আত্মবিশ্বাসে বা আত্মতুষ্টিতে, প্রথম এগারর আটজনকে বাদ দিয়ে সেমিফাইনাল খেলতে নেমে পড়েছিল ব্রাজিল!
তৃতীয় স্থানের খেলায় লিওনিদাস অধিনায়ক এবং ব্রাজিল ০–২ পিছিয়ে পড়ে ৪–২ জয়ী সুইডেনের বিরুদ্ধে, লিওনিদাসের দুগোল, প্রতিযোগিতায় মোট আট।
আজ এমন হলে? ব্রাজিল কোচের কোর্ট মার্শাল হয়ে যেতেই পারত!
[caption id="attachment_4236" align="aligncenter" width="800"]
টানা দুবার বিশ্বকাপজয়ী একমাত্র কোচ ইতালির ভিত্তোরিও পোজো[/caption]ফাইনাল
বিশ্বজয়ীদের নিয়ে সামান্য হলেও কথা উঠেছিল। পোজোর পছন্দ না হওয়াই স্বাভাবিক। তাই দল গড়েছিলেন নতুনদের নিয়ে। পুরনোদের মধ্যে ফেরারি, মেয়াজারা ছিলেন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে। আর ছিল শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে বুঝিয়ে দেওয়ার রোখ, চ্যাম্পিয়নদের যা সহজাত।
উল্টোদিকের দলে প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার অতি–উৎসাহ, যার নিটফল ৬ মিনিটের মধ্যে গোল খাওয়া। সে সময় হাঙ্গেরির দুজনের বেশি ফুটবলার নিজেদের অর্ধে ছিলেন না। একেবারে ফাঁকায় কোলাউসিকে সাজিয়ে দিয়েছিলেন বিয়াভাতি। কিন্তু, এক মিনিটের মধ্যেই সারোসির পা থেকে বেরল তিতকোসের জন্য বল, গোল না করাও কঠিন সেখানে।
ইতালি অবশ্য খেলার নিয়ন্ত্রণ আর হারায়নি। গায়েগতরে খেলতে ইতালির খুব বেশি কষ্ট কখনও তেমন করতে হয়নি, খালি প্রয়োজনটা বুঝতে পারলেই হল। সারোসি আবার একটু গা–বাঁচিয়ে খেলার লোক। হাঙ্গেরির সমস্যা বাড়ল তাতে। পিওলা, লোকাতেলি, বিয়াভাতি, মেয়াজাদের দখলে মাঝমাঠ, হাঙ্গেরীয়রা সুবিধে করে দিচ্ছিল ঘর ফাঁকা রেখে আক্রমণে উঠে। ৩৫ মিনিটে ৩–১, সারোসি যখন ব্যবধান কমালেন, ম্যাচে তখন ইতালীয়দের দাপট, শেষে ৮২ মিনিটে পিওলার দ্বিতীয় গোল এবং ইতালীয়দের কান্নায় ভেঙে পড়া ম্যাচ শেষে।
পোজো দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিথর। আজ পর্যন্ত আর হয়নি কখনও এমন। একই কোচের পরপর দুবার বিশ্বকাপ জয়, খেতাব ধরে রাখা, এখন তো অভাবনীয়।
তারপর? গ্ল্যানভিল যেমন লিখেছেন, ‘আগামী ১২ বছর আর কোনও বিশ্বকাপ নেই’!
(আগামিকাল ১৯৫০ ব্রাজিল)
No comments