বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ৩/ মুসোলিনির ভয়ে ফিফা চুপ / কাশীনাথ ভট্টাচার্য
[avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]
ফাসিস্ত ইতালি, মুসোলিনির ইতালি, রঙ্গমঞ্চের ইতালি, ফুটবলের ইতালি!
অ্যাডলফ হিটলারের বছর দশেক আগে থেকে ক্ষমতায় থাকা বেনিতো মুসোলিনির দেশকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া উচিত কিনা, দ্বিধায় ছিল ফিফাও। আটবার তাই বিশেষ বৈঠক। শেষ পর্যন্ত ১৯৩২ ফিফা কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
উরুগুয়ে বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছিল, ঠিকঠাক এগোলে অংশগ্রহণকারী সব দলের খরচ মিটিয়েও লাভ ভালই করা যায়। মুসোলিনির তাই সহজ দুই লক্ষ্য — বিশ্বকে বোঝানো তাঁর সরকার ভালভাবেই দেশ চালাচ্ছে এবং লাভের বিরাট অঙ্ক।
সমস্যা হল, বিশ্বকাপ ইউরোপে পৌঁছনমাত্র ৩২ দেশ আগ্রহী হয়ে পড়ল খেলতে। ফলে, কোনও এক শহরে আর বিশ্বকাপকে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয় নিশ্চিত হয়ে গেল যেমন, সংগঠকরাও বাধ্য হলেন বাছাইপর্বের খেলার আয়োজনে।
এখন যা ভাবাই যায় না, সেবার আয়োজক ইতালিকেও খেলতে হয়েছিল বাছাইপর্বে। গ্রিসকে ০–৪ উড়িয়ে দিয়ে মূলপর্বে গিয়েছিল ভিত্তোরিও পোজোর ইতালি।
পোজো এবং উগো মেজল, সে সময় ফুটবল বিশ্বের দুই বন্দিত কোচ বা ম্যানেজার। ট্যাকটিসিয়ান হিসেবে তত খ্যাতি ছিল না পোজোর, ম্যানেজার হিসেবে দল চালানোয় অবশ্য অনন্য। তাঁর সেন্টার ফরোয়ার্ড এবং সেন্টার হাফের সম্পর্ক খারাপ। ‘কোমিশারিও তেকনিকো’ (Commissario tecnico) পোজোর নিয়মে দুজনকে থাকতে হল এক ঘরে। মারামারি, কাটাকাটি, ফাটাফাটি, যা–ই হোক, ঘরের ভেতর। মাঠে বোঝাপড়া বাড়াতেই হবে, হলও! এছাড়াও, সেই গত শতাব্দীর তিনের দশকেই পোজো ভেবে ফেলেছিলেন প্রান্ত বদলে বিপক্ষকে চমকে দেওয়ার কথা। শুধু ভাবেননি, করেও দেখিয়ে ছিলেন ১৯৩৪ বিশ্বকাপের প্রথম এবং শেষ ম্যাচে। সিয়াভিও এবং গুয়াইতার প্রান্ত বদলে দিয়েছিলেন, ফলে ফাইনালে দিশাহীন বিপক্ষ চেকোস্লোভাকিয়া। আজ, ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে প্রেসিং ফুটবলের ৪৮ বছর পর, প্রান্ত বদলানো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু, সেই ১৯৩৪ সালে কোথায় রাইনাস মিশেল!
অস্ট্রিয়ার ‘ওয়ান্ডারটিম’ তৈরি মেজলের হাতে। কর্মসূত্রে ইংল্যান্ডে এসে সেখানকার লাইন বরাবর সোজা দৌড় এবং উঁচু করে তোলা বল দেখতে দেখতে একঘেয়েমির শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া এবং সেই নতুন কিছুর ভাবনায় পাগলামি ভরা দিনগুলোর কথা মেজল লিখে গেছেন ফুটবল–ছাত্রের অবশ্যপাঠ্য ‘সকার রেভলিউশন’বইতে। অস্ট্রিয়ার ‘Wunderteam’ হয়ে ওঠার রহস্য জানতে তাঁর দ্বারস্থ হতেই হবে। আসলে, গত শতাব্দীর তিনের দশক ফুটবল–ভাবনায় অন্তঃসত্ত্বা। হাইবেরিতে সেই সময় ভেবেই চলেছেন হারবার্ট চ্যাপম্যান, সেন্টার হাফকে একটু নিচে নামিয়ে দুই ডিফেন্ডারকে দুদিকে আরও সরিয়ে দিলে কেমন হয়? বিপক্ষের দুই ইনসাইড ফরোয়ার্ডের কাজ কি তা হলে আরও কঠিন হয়ে যাবে না? থার্ডব্যাক সিস্টেম আসছে, অফসাইড নিয়ম পাল্টেছে, হাডার্সফিল্ড থেকে ২–৩–৫ ভেঙে ‘থার্ড ব্যাক’এনেছেন চ্যাপম্যান, পেয়ে গেছেন স্যর অ্যালেক্স জেমসকে, ব্রিটিশ ফুটবলে চলছে আর্সেনালের দশক, ফুটবলে প্রথম ট্যাকটিকাল ‘ইনোভেশন’–এর যুগ। তবুও, ১৯৩৪ বিশ্বকাপেও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের কোনও দল যোগ দেয়নি। বাছাইপর্বে অংশগ্রহণকারী ৩২ দেশের মধ্যে ২২ দেশ ইউরোপের, আমেরিকার ৮ দল, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে একটি করে দেশ। মূলপর্বে আফ্রিকা থেকে প্রথম দেশ খেলল বিশ্বকাপে মরক্কো।
যায়নি উরুগুয়েও। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেই প্রথম (এবং শেষবারও!) কোনও দেশ বিশ্বজয়ী খেতাব ধরে রাখতে উৎসাহ দেখায়নি। তাঁদের দেশে খেলতে আগ্রহী না–হওয়া ইউরোপীয় দেশগুলিকে জবাব দেওয়ার প্রশ্ন তো ছিলই, উরুগুয়ের সেরা দলও তখন ভেঙে গিয়েছে। তা ছাড়া, নকআউট প্রতিযোগিতা। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে একটা ম্যাচ খেলার জন্য যাওয়া কঠিন। ব্রাজিল, আর্জেন্তিনার যেমন হয়েছিল। ৮০০০ মাইল গিয়ে একটি করে ম্যাচ খেলে হেরে আবার ৮০০০ মাইল পাড়ি জমানো — তখনকার হিসেবে পরিশ্রম প্রচুর।
[caption id="attachment_4221" align="aligncenter" width="1280"]
বিশ্বকাপ দেখেছিল ফুটবলারদের নাৎসি স্যালুটও[/caption]
মুসোলিনির প্রভাবে ফিফাও বিশেষ কথা বলেনি তখন। পোজোর দলে বেশ কয়েকজন বিদেশি ছিলেন, বিশেষত আর্জেন্তিনা থেকে। সবার আগে মন্তি। উরুগুয়ে বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার হয়ে ফাইনালে হারার পর মন্তি যোগ দেন পোজোর দলে। দুই বিভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার রেকর্ড আর কারও নেই। জুভেন্তাসকে চারবার ইতালীয় লিগ এনে দেওয়ার পর পোজোর দলে মন্তির জায়গা নিয়ে সংশয় ছিল না। গুয়াইতা, স্কোপেলি, ওরসি–রাও ছিলেন, সঙ্গে ব্রাজিলের ফিলো, উরুগুয়ের মাসেরোনি। জানতেন, উইঙ্গার সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কিছু ফুটবলার দলে নেওয়া। ফিফা চুপ করে ছিল। ইতালীয় ভাষায় বলা হত‘ওরিউন্দি’ (Oriundi)। ভিনদেশি তাঁদের অনেককেই সেনাবাহিনীর জন্য ডাকা হয়েছিল। পোজো তাই পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘If they can die for Italy, they can play for Italy.’
প্রাথমিক রাউন্ডেই বড় দলগুলিকে জয় পেতে ঘাম ঝরাতে হয়েছিল বেশ কয়েকটি ম্যাচে। চেকদের সমস্যা বাড়িয়েছিল রোমানিয়া (২–১), অস্ট্রিয়াকে শেষ পর্যন্ত লড়তে বাধ্য করেছিল ফ্রান্স (৩–২), স্পেনের কাছে ব্রাজিলের হার ৩–১, সুইটজারল্যান্ড ৩–২ জিতেছিল হল্যান্ডের বিরুদ্ধে, একই ফলে সুইডেন হারিয়েছিল আর্জেন্তিনাকে,হাঙ্গেরি–মিশর ৪–২, জার্মানি–বেলজিয়াম ৫–২, ইতালি–যুক্তরাষ্ট্র ৭–১!
কোয়ার্টার ফাইনালের চার ম্যাচেই হাড্ডাহাড্ডি। জার্মানি–বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি ২–১, চেকরা ৩–২ জিতেছিল সুইটজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সবচেয়ে সমস্যায় আয়োজকরা। স্পেনের বিরুদ্ধে প্রথম দিন ১–১, বিশ্বকাপের প্রথম রিপ্লে ম্যাচে শেষ পর্যন্ত মেয়াজার গোলে ইতালি সেমিফাইনালে।
চেকোস্লোভাকিয়া ৩–১ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে সহজে ফাইনালে পৌঁছলেও ইতালি–অস্ট্রিয়া ম্যাচ নিয়ে ফুটবল বিশ্ব আলোড়িত হয়েছিল। এখন খেলা হলে দুই কোচের লড়াই, অর্থাৎ ‘পোজো বনাম মেজল’ নাম দিয়ে দেওয়া হত। বিশ্বকাপের আগেই ওয়ান্ডারটিম ৪–২ হারিয়েছিল ইতালিকে। বিশ্বকাপে অবশ্য প্রতিশোধ নেয় ইতালি। সান সিরোয় গুয়াইতার একমাত্র গোলে কোনওরকমে জিতে ফাইনালে আয়োজকরা।
ফাইনাল
এবার আর প্রাণের ভয় ছিল না মন্তির!
দুই গোলরক্ষক–অধিনায়কের প্রথম এবং শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। ইতালির নেতৃত্বে কোম্বি, চেকদের প্ল্যানিকা। অর্থাৎ একজন গোলরক্ষক অধিনায়কের হাতে প্রথমবার বিশ্বকাপ উঠছে, নিশ্চিত ছিল ম্যাচের আগেই। ম্যাচ শেষে তা ওঠে কোম্বির হাতে। পরে, ১৯৮২ সালে ইতালিরই দিনো জোফ এবং ২০১০ সালে স্পেনের ইকের কাসিয়াস, গোলরক্ষক–অধিনায়ক হিসেবে জিতেছেন বিশ্বকাপ।
ড্রাগের প্রভাবও ছিল সেই ১৯৩৪ ফাইনালে। ফেরারিস–এর সঙ্গে সংঘর্ষে আঘাত পেয়ে মাঠের বাইরে যেতে হয়েছিল পুককে। বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুকের নাকের সামনে ধরা হয়েছিল অ্যামোনিয়ার পুঁটলি। চেগে উঠে মাঠে নেমে নেইয়েডলির পাস ধরে মোনজেগলিও–র ট্যাকল পেরিয়ে নিচু শটে সমতা ফিরিয়ে ছিলেন পুক।
অতিরিক্ত সময়ে পোজোর মাস্টার স্ট্রোক, সিয়াভিও এবং গুয়াইতাকে প্রান্ত বদলাতে বলা। চেকরা খেয়ালই করেনি। তাঁদের সেন্টার হাফ কাম্বাল ওপরে উঠে খেলতেই পছন্দ করতেন। তাই, মেয়াজা যখন গুয়াইতাকে খুঁজে পেলেন ৯৫ মিনিটে, কাম্বাল ধারেকাছে নেই। গুয়াইতা বল ধরে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে আবিষ্কার করলেন যেন,সিয়াভিও আছেন অরক্ষিত। ২–১ করতে ভুল করেননি সিয়াভিও।
ফাসিস্তরা এই জয়ের কথা ফলাও করে তাঁদের পুস্তিকায় প্রচার করলেও, ইতালিতে বিশ্বকাপ খুব উঁচু মানের ফুটবল দেখায়নি, সন্দেহ ছিল না কোনও বিশেষজ্ঞেরই। এমনকি, যোগ্য দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়নি, এমন কথাও বলেছিলেন কেউ কেউ, চুপিসারে। মুসোলিনির ভয়ে জোরে বলার ক্ষমতাও ছিল না কারও।
কিন্তু, চার বছর পরই যোগ্যতা সম্পর্কিত সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছিল পোজোর ইতালি, ফ্রান্সে গিয়ে!
(আগামিকাল ১৯৩৮ ফ্রান্স)
ফাসিস্ত ইতালি, মুসোলিনির ইতালি, রঙ্গমঞ্চের ইতালি, ফুটবলের ইতালি!
অ্যাডলফ হিটলারের বছর দশেক আগে থেকে ক্ষমতায় থাকা বেনিতো মুসোলিনির দেশকে বিশ্বকাপের দায়িত্ব দেওয়া উচিত কিনা, দ্বিধায় ছিল ফিফাও। আটবার তাই বিশেষ বৈঠক। শেষ পর্যন্ত ১৯৩২ ফিফা কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
উরুগুয়ে বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছিল, ঠিকঠাক এগোলে অংশগ্রহণকারী সব দলের খরচ মিটিয়েও লাভ ভালই করা যায়। মুসোলিনির তাই সহজ দুই লক্ষ্য — বিশ্বকে বোঝানো তাঁর সরকার ভালভাবেই দেশ চালাচ্ছে এবং লাভের বিরাট অঙ্ক।
সমস্যা হল, বিশ্বকাপ ইউরোপে পৌঁছনমাত্র ৩২ দেশ আগ্রহী হয়ে পড়ল খেলতে। ফলে, কোনও এক শহরে আর বিশ্বকাপকে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয় নিশ্চিত হয়ে গেল যেমন, সংগঠকরাও বাধ্য হলেন বাছাইপর্বের খেলার আয়োজনে।
এখন যা ভাবাই যায় না, সেবার আয়োজক ইতালিকেও খেলতে হয়েছিল বাছাইপর্বে। গ্রিসকে ০–৪ উড়িয়ে দিয়ে মূলপর্বে গিয়েছিল ভিত্তোরিও পোজোর ইতালি।
পোজো এবং উগো মেজল, সে সময় ফুটবল বিশ্বের দুই বন্দিত কোচ বা ম্যানেজার। ট্যাকটিসিয়ান হিসেবে তত খ্যাতি ছিল না পোজোর, ম্যানেজার হিসেবে দল চালানোয় অবশ্য অনন্য। তাঁর সেন্টার ফরোয়ার্ড এবং সেন্টার হাফের সম্পর্ক খারাপ। ‘কোমিশারিও তেকনিকো’ (Commissario tecnico) পোজোর নিয়মে দুজনকে থাকতে হল এক ঘরে। মারামারি, কাটাকাটি, ফাটাফাটি, যা–ই হোক, ঘরের ভেতর। মাঠে বোঝাপড়া বাড়াতেই হবে, হলও! এছাড়াও, সেই গত শতাব্দীর তিনের দশকেই পোজো ভেবে ফেলেছিলেন প্রান্ত বদলে বিপক্ষকে চমকে দেওয়ার কথা। শুধু ভাবেননি, করেও দেখিয়ে ছিলেন ১৯৩৪ বিশ্বকাপের প্রথম এবং শেষ ম্যাচে। সিয়াভিও এবং গুয়াইতার প্রান্ত বদলে দিয়েছিলেন, ফলে ফাইনালে দিশাহীন বিপক্ষ চেকোস্লোভাকিয়া। আজ, ২০১৮ সালে দাঁড়িয়ে প্রেসিং ফুটবলের ৪৮ বছর পর, প্রান্ত বদলানো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু, সেই ১৯৩৪ সালে কোথায় রাইনাস মিশেল!
অস্ট্রিয়ার ‘ওয়ান্ডারটিম’ তৈরি মেজলের হাতে। কর্মসূত্রে ইংল্যান্ডে এসে সেখানকার লাইন বরাবর সোজা দৌড় এবং উঁচু করে তোলা বল দেখতে দেখতে একঘেয়েমির শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া এবং সেই নতুন কিছুর ভাবনায় পাগলামি ভরা দিনগুলোর কথা মেজল লিখে গেছেন ফুটবল–ছাত্রের অবশ্যপাঠ্য ‘সকার রেভলিউশন’বইতে। অস্ট্রিয়ার ‘Wunderteam’ হয়ে ওঠার রহস্য জানতে তাঁর দ্বারস্থ হতেই হবে। আসলে, গত শতাব্দীর তিনের দশক ফুটবল–ভাবনায় অন্তঃসত্ত্বা। হাইবেরিতে সেই সময় ভেবেই চলেছেন হারবার্ট চ্যাপম্যান, সেন্টার হাফকে একটু নিচে নামিয়ে দুই ডিফেন্ডারকে দুদিকে আরও সরিয়ে দিলে কেমন হয়? বিপক্ষের দুই ইনসাইড ফরোয়ার্ডের কাজ কি তা হলে আরও কঠিন হয়ে যাবে না? থার্ডব্যাক সিস্টেম আসছে, অফসাইড নিয়ম পাল্টেছে, হাডার্সফিল্ড থেকে ২–৩–৫ ভেঙে ‘থার্ড ব্যাক’এনেছেন চ্যাপম্যান, পেয়ে গেছেন স্যর অ্যালেক্স জেমসকে, ব্রিটিশ ফুটবলে চলছে আর্সেনালের দশক, ফুটবলে প্রথম ট্যাকটিকাল ‘ইনোভেশন’–এর যুগ। তবুও, ১৯৩৪ বিশ্বকাপেও ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের কোনও দল যোগ দেয়নি। বাছাইপর্বে অংশগ্রহণকারী ৩২ দেশের মধ্যে ২২ দেশ ইউরোপের, আমেরিকার ৮ দল, আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে একটি করে দেশ। মূলপর্বে আফ্রিকা থেকে প্রথম দেশ খেলল বিশ্বকাপে মরক্কো।
যায়নি উরুগুয়েও। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেই প্রথম (এবং শেষবারও!) কোনও দেশ বিশ্বজয়ী খেতাব ধরে রাখতে উৎসাহ দেখায়নি। তাঁদের দেশে খেলতে আগ্রহী না–হওয়া ইউরোপীয় দেশগুলিকে জবাব দেওয়ার প্রশ্ন তো ছিলই, উরুগুয়ের সেরা দলও তখন ভেঙে গিয়েছে। তা ছাড়া, নকআউট প্রতিযোগিতা। হাজার হাজার মাইল দূর থেকে একটা ম্যাচ খেলার জন্য যাওয়া কঠিন। ব্রাজিল, আর্জেন্তিনার যেমন হয়েছিল। ৮০০০ মাইল গিয়ে একটি করে ম্যাচ খেলে হেরে আবার ৮০০০ মাইল পাড়ি জমানো — তখনকার হিসেবে পরিশ্রম প্রচুর।
[caption id="attachment_4221" align="aligncenter" width="1280"]
বিশ্বকাপ দেখেছিল ফুটবলারদের নাৎসি স্যালুটও[/caption]মুসোলিনির প্রভাবে ফিফাও বিশেষ কথা বলেনি তখন। পোজোর দলে বেশ কয়েকজন বিদেশি ছিলেন, বিশেষত আর্জেন্তিনা থেকে। সবার আগে মন্তি। উরুগুয়ে বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনার হয়ে ফাইনালে হারার পর মন্তি যোগ দেন পোজোর দলে। দুই বিভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার রেকর্ড আর কারও নেই। জুভেন্তাসকে চারবার ইতালীয় লিগ এনে দেওয়ার পর পোজোর দলে মন্তির জায়গা নিয়ে সংশয় ছিল না। গুয়াইতা, স্কোপেলি, ওরসি–রাও ছিলেন, সঙ্গে ব্রাজিলের ফিলো, উরুগুয়ের মাসেরোনি। জানতেন, উইঙ্গার সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কিছু ফুটবলার দলে নেওয়া। ফিফা চুপ করে ছিল। ইতালীয় ভাষায় বলা হত‘ওরিউন্দি’ (Oriundi)। ভিনদেশি তাঁদের অনেককেই সেনাবাহিনীর জন্য ডাকা হয়েছিল। পোজো তাই পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘If they can die for Italy, they can play for Italy.’
প্রাথমিক রাউন্ডেই বড় দলগুলিকে জয় পেতে ঘাম ঝরাতে হয়েছিল বেশ কয়েকটি ম্যাচে। চেকদের সমস্যা বাড়িয়েছিল রোমানিয়া (২–১), অস্ট্রিয়াকে শেষ পর্যন্ত লড়তে বাধ্য করেছিল ফ্রান্স (৩–২), স্পেনের কাছে ব্রাজিলের হার ৩–১, সুইটজারল্যান্ড ৩–২ জিতেছিল হল্যান্ডের বিরুদ্ধে, একই ফলে সুইডেন হারিয়েছিল আর্জেন্তিনাকে,হাঙ্গেরি–মিশর ৪–২, জার্মানি–বেলজিয়াম ৫–২, ইতালি–যুক্তরাষ্ট্র ৭–১!
কোয়ার্টার ফাইনালের চার ম্যাচেই হাড্ডাহাড্ডি। জার্মানি–বেলজিয়াম ও অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি ২–১, চেকরা ৩–২ জিতেছিল সুইটজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সবচেয়ে সমস্যায় আয়োজকরা। স্পেনের বিরুদ্ধে প্রথম দিন ১–১, বিশ্বকাপের প্রথম রিপ্লে ম্যাচে শেষ পর্যন্ত মেয়াজার গোলে ইতালি সেমিফাইনালে।
চেকোস্লোভাকিয়া ৩–১ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে সহজে ফাইনালে পৌঁছলেও ইতালি–অস্ট্রিয়া ম্যাচ নিয়ে ফুটবল বিশ্ব আলোড়িত হয়েছিল। এখন খেলা হলে দুই কোচের লড়াই, অর্থাৎ ‘পোজো বনাম মেজল’ নাম দিয়ে দেওয়া হত। বিশ্বকাপের আগেই ওয়ান্ডারটিম ৪–২ হারিয়েছিল ইতালিকে। বিশ্বকাপে অবশ্য প্রতিশোধ নেয় ইতালি। সান সিরোয় গুয়াইতার একমাত্র গোলে কোনওরকমে জিতে ফাইনালে আয়োজকরা।
ফাইনাল
এবার আর প্রাণের ভয় ছিল না মন্তির!
দুই গোলরক্ষক–অধিনায়কের প্রথম এবং শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। ইতালির নেতৃত্বে কোম্বি, চেকদের প্ল্যানিকা। অর্থাৎ একজন গোলরক্ষক অধিনায়কের হাতে প্রথমবার বিশ্বকাপ উঠছে, নিশ্চিত ছিল ম্যাচের আগেই। ম্যাচ শেষে তা ওঠে কোম্বির হাতে। পরে, ১৯৮২ সালে ইতালিরই দিনো জোফ এবং ২০১০ সালে স্পেনের ইকের কাসিয়াস, গোলরক্ষক–অধিনায়ক হিসেবে জিতেছেন বিশ্বকাপ।
ড্রাগের প্রভাবও ছিল সেই ১৯৩৪ ফাইনালে। ফেরারিস–এর সঙ্গে সংঘর্ষে আঘাত পেয়ে মাঠের বাইরে যেতে হয়েছিল পুককে। বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুকের নাকের সামনে ধরা হয়েছিল অ্যামোনিয়ার পুঁটলি। চেগে উঠে মাঠে নেমে নেইয়েডলির পাস ধরে মোনজেগলিও–র ট্যাকল পেরিয়ে নিচু শটে সমতা ফিরিয়ে ছিলেন পুক।
অতিরিক্ত সময়ে পোজোর মাস্টার স্ট্রোক, সিয়াভিও এবং গুয়াইতাকে প্রান্ত বদলাতে বলা। চেকরা খেয়ালই করেনি। তাঁদের সেন্টার হাফ কাম্বাল ওপরে উঠে খেলতেই পছন্দ করতেন। তাই, মেয়াজা যখন গুয়াইতাকে খুঁজে পেলেন ৯৫ মিনিটে, কাম্বাল ধারেকাছে নেই। গুয়াইতা বল ধরে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে আবিষ্কার করলেন যেন,সিয়াভিও আছেন অরক্ষিত। ২–১ করতে ভুল করেননি সিয়াভিও।
ফাসিস্তরা এই জয়ের কথা ফলাও করে তাঁদের পুস্তিকায় প্রচার করলেও, ইতালিতে বিশ্বকাপ খুব উঁচু মানের ফুটবল দেখায়নি, সন্দেহ ছিল না কোনও বিশেষজ্ঞেরই। এমনকি, যোগ্য দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়নি, এমন কথাও বলেছিলেন কেউ কেউ, চুপিসারে। মুসোলিনির ভয়ে জোরে বলার ক্ষমতাও ছিল না কারও।
কিন্তু, চার বছর পরই যোগ্যতা সম্পর্কিত সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিয়েছিল পোজোর ইতালি, ফ্রান্সে গিয়ে!
(আগামিকাল ১৯৩৮ ফ্রান্স)
No comments