বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ২/ ফাইনালে খুনের হুমকিও! / কাশীনাথ ভট্টাচার্য
'Other countries have their history while Uruguay has its football.'
- Ondino Viera (1966)
[avatar user="kashibhatta" size="thumbnail" align="left" /]
ইউরোপের নাক অনেক উঁচুতে, উরুগুয়ের সে সব ভাবার সময় ছিল না।
অস্ট্রিয়ার ‘ওয়ান্ডারটিম’ (Wunderteam), হাঙ্গেরি, ইতালি, জার্মানি, স্পেন অংশ নেয়নি। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ইস্তফা দিয়েছিল ফিফা থেকেই। বিশ্বকাপে খেলার প্রশ্নই নেই তাই। অর্থাৎ, ইউরোপ থেকে বিশ্বকাপের দাবিদার বড় দেশগুলির একটিও উদ্বোধনী বিশ্বকাপে খেলেনি ভিন্ন ভিন্ন কারণে। চার দেশের অভিমান, তাদের আয়োজক হওয়ার ইচ্ছেকে আমল দেয়নি ফিফা। খরচ উরুগুয়ের দিয়ে দেবে বলায় ‘ছোট্ট’ গরিব দেশের কাছে খরচ নিয়ে নিজেদের সম্মান খোয়াতে রাজি ছিল না অনেক দেশ, কারও কারও কাছে আবার সমুদ্রযাত্রার বিভীষিকা এত বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল যে, যেতে পারেনি। সব মিলিয়ে ইউরোপীয়দের এই ‘বয়কট’ যে আদৌ ভাল চোখে নেয়নি উরুগুয়ে, বুঝতে চার বছর লেগেছিল ফিফার। ১৯৩৪ সালে ইতালি বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত প্রথম এবং শেষবার, আগের বিশ্বজয়ীরা নিজেদের খেতাব ধরে রাখতে যাননি। কোনও লুকোছাপা করেনি, উরুগুয়ে ফুটবল সংস্থা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল, উদ্বোধনী বিশ্বকাপে তাঁদের সঙ্গে অসহযোগিতার প্রতিবাদে ইউরোপে বিশ্বকাপ বয়কট করছে। খরচ, সাগরপাড়ি বা সমুদ্রপীড়া— কোনও অজুহাত নয়। স্রেফ দাপট। তাই অকপট। ‘তোরা আসিসনি যখন আমরাও যাব না।’দক্ষিণ আমেরিকা এমনই।
[caption id="attachment_4205" align="alignleft" width="400"]
প্রথম বিশ্বকাপের পোস্টার[/caption]আর, দাপট হবে না–ই বা কেন? বিশ্ব ফুটবলকে উরুগুয়ে নিজেদের আগমনী গানে আবিষ্ট করে তোলার আগে ফুটবল তো ছিল ইংরেজ আর স্কটিশদের পেশীবহুল প্রদর্শনী। সেই ধাক্কাধাক্কি, গুঁতোগুঁতি, মারামারির রাগবিয়ানা ছেড়ে ব্রিটিশ ফুটবল এই ৮৮ বছরে খুব যে এগিয়েছে তা–ও নয়। উরুগুয়ে কিন্তু তখনই লং বল ছেড়ে দিয়েছে, খেলছে ছোট পাসে। আকাশে নয়, মাটিতে নামিয়ে এনেছে বল। সোজা নয়, দৌড়চ্ছে এঁকেবেঁকে। ১৯২৪ আর ১৯২৮— দুই অলিম্পিকে নাকানিচোবানি খাইয়েছে তুলনায় অনেক বেশি প্রচারিত তখনই ইউরোপীয় বড়দাদের। ‘এ কেমন ধারা ফুটবল’ বলে হা–হুতাশও শুরু তখন থেকেই।
প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ অবশ্য খেলেছিল ফ্রান্স–মেহিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম। প্রথম গোল ফ্রান্সের লুসিয়ে লরাঁর, ফ্রান্স ওই ম্যাচে জিতেছিল ৪–১। মেহিকোর হয়ে খেলেছিলেন মানুয়েল এবং ফেলিপে রোইয়াস— দুই ভাই। ফ্রান্স–মেহিকো ম্যাচের রেফারি ছিলেন দোমিঙ্গো লোম্বার্তি (উরুগুয়ে), যুক্তরাষ্ট্র–বেলজিয়াম ম্যাচে আর্জেন্তিনার হোসে মাসিয়াস। যুক্তরাষ্ট্র ৩–০ হারিয়েছিল বেলজিয়ামকে। দুটি ম্যাচ একই সময়ে শুরু হলেও লরাঁ গোল করেছিলেন ১৯ মিনিটে, যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট ম্যাকঘি ৪১ মিনিটে। তাই বিশ্বকাপে প্রথম গোলের কৃতিত্ব লরাঁর।
মোট ১৩ দল অংশ নিয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপে। চার গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল, প্রতি গ্রুপে বাছাই দলের মর্যাদা পেয়েছিল যথাক্রমে আর্জেন্তিনা, ব্রাজিল, উরুগুয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম গ্রুপে ছিল আর্জেন্তিনা, ফ্রান্স, চিলে, মেহিকো। দ্বিতীয় গ্রুপ: ব্রাজিল, বলিভিয়া, যুগোস্লাভিয়া। তৃতীয় গ্রুপ: উরুগুয়ে, পেরু, রোমানিয়া। চতুর্থ গ্রুপ: যুক্তরাষ্ট্র, পারাগুয়ে, বেলজিয়াম। নিয়ম ছিল, প্রত্যেক গ্রুপের শীর্ষে থাকা চার দল সরাসরি সেমিফাইনালে খেলবে। তাই বিশ্বকাপের দুই সেমিফাইনাল যথাক্রমে আর্জেন্তিনা–যুক্তরাষ্ট্র এবং উরুগুয়ে–যুগোস্লাভিয়া। শেষ দুই ম্যাচেরই ফল ৬–১। কিন্তু তার আগে গ্রুপ লিগের কিছু ঘটনা—
(১) ১৩ জুলাই, ১৯৩০ প্রতিযোগিতা শুরু হলেও আয়োজক দেশ প্রথম ম্যাচ খেলেছিল ১৮ জুলাই, নবনির্মিত সেন্তেনারিও স্টেডিয়ামে। প্রতিযোগিতার আগে বর্ষায় ঠিক সময়ে স্টেডিয়ামের কাজ শেষ করা যায়নি। কিন্তু, স্বাধীনতার শতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে নির্মিত স্টেডিয়ামেই প্রথম ম্যাচ খেলতে চেয়েছিল উরুগুয়ে। মন্তেভিদিওয় ওই ম্যাচে ৫৭,৭৩৫ দর্শকের সামনে তাঁরা অবশ্য ছন্নছাড়া খেলে ১–০ জেতে পেরুর বিরুদ্ধে।
[caption id="attachment_4206" align="aligncenter" width="650"]
প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসে উরুগুয়েকে শ্রদ্ধা জানাতে বলিভিয়ার ফুটবলারদের জার্সিতে লেখা ‘ভিভা উরুগুয়ে’[/caption](২) আর্জেন্তিনা–ফ্রান্স ম্যাচে (১৫ জুলাই, পার্ক সেন্ত্রাল) ব্রাজিলীয় রেফারি গিলবার্তো দি আলমেইদা রেগোর ভুলে বিরাট সুবিধে পেয়ে গিয়েছিল আর্জেন্তিনা। লুইস মন্তির ৮১ মিনিটের গোলে এগিয়ে ছিল। কিন্তু দু’দিনের মধ্যে দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নামা ফরাসিরা গোল খেয়ে মরিয়া হয়ে উঠছিল আক্রমণে। তিন মিনিট পর, ব্রায়ান গ্ল্যানভিল লিখেছেন তাঁর ‘দ্য স্টোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইতে, ফরাসিরা গোল শোধ করে দিতে পারত। মাসিনতকে সঙ্গে নিয়ে মার্বেল লানগিলার পৌঁছে গিয়েছিলেন গোলমুখে, কিন্তু ব্রাজিলীয় রেফারি খেলা শেষের বাঁশি বাজিয়ে দেন। গণ্ডগোলের চূড়ান্ত। আর্জেন্তিনার সমর্থকরা মাঠে নেমে পড়েছে জয়ের আনন্দে, ফরাসিরা রেফারিকে ঘিরে বোঝাচ্ছে ৬ মিনিট বাকি তখনও। ঘোড়সওয়ার পুলিস মাঠ ফাঁকা করল, সেনর রেগো বুঝলেন কী বিরাট ভুল করে ফেলেছিলেন, কথা বললেন সহকারীদের সঙ্গে, আকাশের দিকে তাকিয়ে ভুল স্বীকার করলেন। আর, যখন আবার খেলা শুরুর বাঁশি বাজালেন ওই বাকি ৬ মিনিটের জন্য, আর্জেন্তিনার ইনসাইড লেফট মূর্ছিত।
(৩) বিশ্বকাপের প্রথম পেনাল্টি দিয়েছিলেন উরুগুয়ের রেফারি আনিবাল তেজাদা। ফ্রান্স–চিলে ম্যাচে চিলের পক্ষে, ১৯ জুলাই, ১৯৩০। কিন্তু চিলের কার্লোস ভিদালের শট ফ্রান্সের গোলরক্ষক আলেরি থেপো বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
(৪) সেন্তেনারিও স্টেডিয়ামে ওই একই দিনে (১৯ জুলাই) দ্বিতীয় ম্যাচ খেলেছিল আর্জেন্তিনা–মেহিকো। আর্জেন্তিনা জিতেছিল ৬–৩, বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিক গিলেরমো স্তাবিলের। অথচ স্তাবিলের সুযোগ পাওয়ারই কথা নয়। অধিনায়ক মানুয়েল ফেরেরা আইন পরীক্ষা দিতে বুয়েনোস আইরেসে ফিরে যাওয়ায় আনকোরা যুবক স্তাবিলে সুযোগ পান এবং প্রথম সুযোগেই হ্যাটট্রিক। আন্তর্জাতিক আসরে অভিষেক বিশ্বকাপে এবং অভিষেকেই হ্যাটট্রিক— স্তাবিলে পথপ্রদর্শক। ওই ম্যাচ অবশ্য আরও বিখ্যাত হয়ে আছে বলিভিয়ার রেফারি উলিসিস সসোদা–র জন্য। তিনটি (মতান্তরে পাঁচটি?) পেনাল্টি দিয়েছিলেন ম্যাচে। পেনাল্টি থেকে বিশ্বকাপে প্রথম গোলের কৃতিত্ব মেহিকোর মানুয়েল রোইয়াসের।
(৫) দক্ষিণ আমেরিকার দেশ হিসেবে বলিভিয়া এত গর্বিত ছিল উরুগুয়ে সম্পর্কে যে, তাঁদের প্রথম ম্যাচে বলিভিয়ার প্রত্যেক ফুটবলারের জার্সিতে একটি করে অক্ষর লেখা ছিল ইংরেজিতে, একসঙ্গে করলে যা দাঁড়াত ‘VIVA URUGUAY’! এবং যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ১৭ জুলাই প্রথম ম্যাচে তাঁরা অঘটন ঘটাতেও পারত, চার–চারবার যুগোস্লাভিয়ার জালে বল পাঠালেও প্রতিবারই উরুগুয়ের রেফারি ফ্রান্সিসকো মাত্তেউচি গোল বাতিল না করে দিলে।
(৬) পাঁচবার বিশ্বকাপজয়ী এবং প্রতিবারই বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার অনন্য রেকর্ড থাকলে কী হবে, বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শুরু কিন্তু হেরে। ১৯ জুলাই, ১৯৩০,মন্তেভিদিও–র পার্ক সেন্ত্রালে যুগোস্লাভিয়ার কাছে ১–২ হেরেছিল ব্রাজিল। একমাত্র গোলটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম, প্রেগুইনিও–র, যাঁর আসল নাম ওয়াও কোয়েলো নেতো। এবং ১৯২৫ সালের পর প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমে সে দিন একসঙ্গে ১০ জন ব্রাজিলীয়র আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল। প্রথম গোলদাতা প্রেগুইনিওর প্রতিভা সীমাবদ্ধ ছিল না শুধু ফুটবলেই। বাস্কেটবল, ভলিবল এবং ওয়াটারপোলাতেও দক্ষতা সুবিদিত।
সেমিফাইনাল
প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল, আর্জেন্তিনা বনাম যুক্তরাষ্ট্র (২৬ জুলাই, সেন্তেনারিও)। যুক্তরাষ্ট্র শেষ চারে পৌঁছলেও আর্জেন্তিনার বিরুদ্ধে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেনি। আর্জেন্তিনা জয়ী ৬–১। স্তাবিলের দু–গোল আবার, কিন্তু ম্যাচ নিয়ে বিতর্ক অন্যত্র। ক্রিস ফ্রেডি তাঁর ‘কমপ্লিট বুক অব ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইতে লিখেছেন, ‘ঘটনা হল, মার্কিন ট্রেনার জ্যাক কোল মাঠে এসেছিলেন যখন, ব্যাগ থেকে ক্লোরোফর্মের শিশি মাঠে পড়ে গিয়েছিল। কোনও রকমে ধুঁকতে ধুঁকতে মাঠ থেকে বেরিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানেজার উইলফ্রড কামিংস অবশ্য এই ঘটনার কথা নিজের রিপোর্টে লেখেননি, কিন্তু স্বীকার করেছিলেন স্মেলিং সল্টের কারণে তাঁর অন্যতম ফুটবলার অল্ট কিছুক্ষণের জন্য চোখে অন্ধকার দেখেছিলেন।’
পরদিন, অর্থাৎ ২৭ জুলাই সেন্তেনারিওতে দ্বিতীয় সেমিফাইনালেও একই ফল, উরুগুয়ে–৬, যুগোস্লাভিয়া–১। পেদ্রো সিয়ার হ্যাটট্রিক। ২৯ বছর ৩২৯ দিন বয়সে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক স্ট্রাইকার হিসেবে হ্যাটট্রিক, যে–রেকর্ড অক্ষত ছিল ১৯৩৮ পর্যন্ত। সুইডেনের টোরে কেলার কিউবার বিরুদ্ধে ম্যাচে ভেঙে দিয়েছিলেন,৩৩ বছর ১৫৯ দিন বয়সে। ফল দেখে যতই একপেশে মনে হোক, প্রথমে গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল যুগোস্লাভিয়াই। এমনকি ১–২ পিছিয়ে থাকা অবস্থায় তাঁদের একটি গোল বাতিলও হয়েছিল। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য ঘরের মাঠে হাজার ৮০ দর্শক সমর্থনে উজ্জীবিত উরুগুয়ের সামনে আর দাঁড়াতেই পারেনি যুগোস্লাভিয়া।
ফাইনাল
দু’বছর আগের অলিম্পিক ফাইনালের পুনরাবৃত্তি। প্রতিবেশি দুই দেশ আবার মুখোমুখি বিশ্বজয়ীর সম্মান পেতে। উত্তেজনা চরমে।
● আর্জেন্তিনার লুইস মন্তিকে খুনের হুমকি।
● বুয়েনোস আইরেস থেকে নৌকো করে ফাইনালের সকালে মন্তেভিদিও পৌঁছলেন আর্জেন্তিনার সমর্থকরা। যাঁরা আসতে পারলেন না, ওপার থেকে বিদায় দিলেন‘আর্জেন্তিনা সি, উরুগুয়ে নো’, ‘জয় নয়ত মৃত্যু’ বলে। এপারে পৌঁছন মাত্র উরুগুয়ের পুলিস ঘিরে ধরল, তল্লাশি চালানো হল আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য অস্ত্রের।
● বেলজিয়ামের রেফারি জন ল্যাঙ্গেনাস নিজের এবং লাইন্সম্যানদের নিরাপত্তার দাবিতে সরব। শেষ বাঁশি বাজিয়ে সবচেয়ে দ্রুত এবং লোকচক্ষুর আড়ালে কীভাবে নদীতে পৌঁছন যাবে, যেখানে অপেক্ষা করবে নৌকো, চিনিয়ে রাখা হল রাস্তাও।
● আর্জেন্তিনার ফুটবলারদের জন্য ২৪ ঘণ্টার পুলিস পাহারা, নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা।
এমন প্রেক্ষাপটে ফাইনাল হলে যা হয়, খেলার শুরুতে নতুন বিতর্ক — কোন্ বলে খেলা হবে?
আর্জেন্তিনা বলল, তাঁদের দেশের সংস্থার তৈরি বলে, উরুগুয়েও চাইল নিজের দেশের বলে খেলতে। ফিফার বিশ্বকাপ সংক্রান্ত নিয়মাবলীতে তখনও বল সংক্রান্ত নির্দেশ ছিল না। রেফারি ল্যাঙ্গেনাস পোড়খাওয়া ইউরোপীয়। দুই অর্ধ দুই দেশের বলে খেলা হবে জানালেন। টসে জিতল আর্জেন্তিনা। ভাগ্যিস, অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়নি ফাইনাল!
ফুটবলের বাইরের এই সব লড়াই সঙ্গে নিয়ে মাঠে ফুটবলের লড়াইও পৌঁছেছিল সর্বোচ্চ স্তরে। বিশ্বজয়ের হ্যাটট্রিক পেতে মরিয়া উরুগুয়ের সঙ্গে শেষ অলিম্পিকে হারের শোধ তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আর্জেন্তিনা, দু’দলেরই মূলধন স্কিল যখন, খেলা তো অন্য মাত্রা পাবেই। উরুগুয়ের অধিনায়ক হোসে নাসাজি তখন বিশ্বসেরা ফুলব্যাক। দেশের হয়ে ৪১ ম্যাচ খেলেছিলেন, প্রতিবারই অধিনায়ক। সঙ্গে ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার হোসে লিয়ান্দ্রো আনদ্রাদে। একতর স্কারোন, কাস্ত্রো, সিয়া, ইরিআর্তেরা প্রথমে এগিয়ে দিয়েছিলেন দলকে। স্কারোনের শট পাতেরনেস্তা ফেরানোর পর কাস্ত্রো বল বাড়িয়েছিলেন ডানদিকে ফাঁকায়। দোরাদোর ডান পা ঝলসে উঠেছিল। কেউ কেউ বলেন আর্জেন্তিনার অভিজ্ঞ গোলরক্ষক বোতাসো গোল খেয়েছিলেন দু’পায়ের ফাঁক দিয়ে। ছবির মতো গোলে সমতা ফেরায় আর্জেন্তিনা। হুয়ান এভেরিস্তোর সঙ্গে মন্তির ওয়ান–টু, ফেরেরাকে ফাঁকায় দেখে এভেরিস্তো দেরি করেননি যেমন, ফেরেরাও ডানদিকে অরক্ষিত পিউসেলিকে বল বাড়ান সঙ্গে সঙ্গেই। উইঙ্গার পিউসেলির ড্রিবল অসাধারণ (আর্জেন্তিনীয় তো!), গেস্তিদোকে ভুল পথে পাঠিয়ে বালেস্তেরোকে দাঁড় করিয়ে রেখে বাঁদিকে জালে রাখেন পিউসেলি। ১৭ মিনিট পর স্বাধীনতার শতবার্ষিকী উদযাপনে তৈরি সেন্তেনারিও স্টেডিয়ামের বেশির ভাগ অংশ চুপ। গোল পাওয়ার পর আলবিসেলেস্তে–দের (আর্জেন্তিনা) রোখা যাচ্ছিল না। মন্তি হঠাৎ ইংরেজ হয়ে গেলেন। আকাশে তুললেন বল, এমনকি নাসাজিও বোকা হলেন, স্তাবিলে বল ধরে আনদ্রাদেকে সুযোগ দেননি, জোরালো শটে নিজের ওই বিশ্বকাপের অষ্টম গোল। ফুটবলের দুর্ভাগ্য, স্তাবিলে বিশ্বকাপের ওই চার ম্যাচের প্রতি ম্যাচে গোল পেয়ে প্রথম বিশ্বকাপেই সর্বোচ্চ গোল করেও আর কখনও আর্জেন্তিনার প্রতিনিধিত্ব করতে পারেননি।
নাসাজি রেফারিকে বোঝানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন, স্তাবিলে অফসাইডে ছিলেন বলে। ল্যাঙ্গেনাস মানেননি। দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে হঠাৎ ‘টাফ’ ফুটবলে চলে যায়। মন্তিরও বোধহয় মনে পড়ে গিয়েছিল খুনের হুমকির কথা। গোটা আর্জেন্তিনাই কেমন যেন মিইয়ে গিয়েছিল, ৫৭ মিনিটে সিয়ার গোল শোধের পর। ভারালুর পা থেকে বল কেড়ে মাসেরোনি এগিয়ে এসে সাজিয়ে দিয়েছিলেন ইরিআর্তেকে, বোতাসো ভাবতেই পারেননি ইরিআর্তে বড় বক্সের বাইরে থেকে আচমকা শট নেবেন (৩–২)। একেবারে শেষ মিনিটে দোরাদোর ক্রস কাস্ত্রোর মাথায়, বোতাসোর বাড়ানো হাতের ওপর দিয়ে হেড জালে রেখে যান কাস্ত্রো।
তারপর যা হয়। শেষ বাঁশি বাজিয়ে কোনও ঝুঁকি না–নিয়ে ল্যাঙ্গেনাসের দৌড় নদীতীরে দাঁড়িয়ে থাকা নৌকোর উদ্দেশ্যে। আলবের্তো সুপিচি, উরুগুয়ের কোচের বাহুবন্ধনে নাসাজিরা। উৎসব করতে গিয়ে এক উরুগুয়ে সমর্থকের মৃত্যু, বুয়েনোস আইরেসে উরুগুয়ে দূতাবাসে ইট–ঢিল। উরুগুয়েতে জাতীয় ছুটি আর আর্জেন্তিনার ৮ ফুটবলারের আর কখনও জাতীয় দলের জার্সি না–পাওয়া।
কিন্তু জুলে রিমের নামাঙ্কিত ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফল্যু–র তৈরি ৫০ হাজার সুইস ফ্রাঁ মূল্যের ট্রফি ফিফা সভাপতি নিজে কার হাতে তুলে দিয়েছিলেন, নাসাজি না উরুগুয়ে ফুটবল সংস্থার সভাপতি রাউল জুদ? উরুগুয়ের অধিনায়ক কি এই সম্মান পাননি? ফিফার ওয়েবসাইটও নিশ্চিত কোনও তথ্য দিচ্ছে না। ছবি অবশ্য বলছে,রাউল জুদের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল ট্রফি।
আশ্চর্য, গ্ল্যানভিলও তাহলে ভুল করেন!
(আগামিকাল ১৯৩৪ ইতালি)
No comments