বিশ্বকাপ আনন্দযজ্ঞে ৬ / পুসকাসের স্বপ্ন খুন! / কাশীনাথ ভট্টাচার্য
বিশ্বকাপের অদ্ভুত ধারা। ফেভারিট হিসেবে একটি বিশেষ দল ছাড়া যখন অন্য কোনও দলের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না চার বছর ধরে, সেই দল কখনও বিশ্বকাপ জেতেনি!
সুইটজারল্যান্ডে উদ্ভুত এই অদ্ভুত সত্যে প্রমাণের সিলমোহর পড়েছিল আরও ২০ বছর পর, জার্মানিতে। এবং, কী আশ্চর্য, দুবারই স্বপ্ন খুনের আসামী পশ্চিম জার্মানি!
এলো রেটিং–এ ১৯৫৪–র হাঙ্গেরি ১৯৭০–এর ব্রাজিলেরও আগে!
না, ছাপার ভুল নয়। এলো রেটিং দাবায় থাকে, পাঁচবারের দাবা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের দেশের মানুষেরও জানা কথা। তা হলে, ফুটবলে সে প্রসঙ্গ কেন এল?
হাঙ্গেরীয় অঙ্কবিদ ড. অ্যারপ্যাড এলো সৃষ্ট র্যাঙ্কিং সিস্টেম মেনে চলে বিশ্ব দাবা সংস্থা ফিডে। সেই এলো রেটিং–কে ফুটবলের জন্য ব্যবহার করেছিলেন প্রথম বব রুনিয়ান, ১৯৯৭ সালে। এখন ফিফার বিশ্ব র্যাঙ্কিং–এর মতো প্রচলিত না হলেও, ফুটবলের এলো রেটিং–ও যথেষ্ট জনপ্রিয়। ফুটবল–উৎসাহী পাঠক ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন ইন্টারনেটে।
যাক গে, এলাটিং বেলাটিং সই লো, এলো রেটিং–ও রইল, আপাতত, ফেরা যাক হাঙ্গেরিতে।
হাঙ্গেরির বিপ্লব ১৯৫৬ সালে। কিন্তু, হাঙ্গেরিয়ান ফুটবলের বিপ্লব তারও আট বছর আগে। ১৯৪৮ সালে যখন সে দেশের কমিউনিস্ট সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল‘সোশ্যালিস্ট ফুটবল’–এর স্বরূপ দেখাতে হবে বহির্বিশ্বকে। ডেপুটি স্পোর্টস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন বুদাপেস্তের প্রাক্তন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা গুস্তাভ সেবেস। তিনিই নির্দেশ দিয়েছিলেন, হাঙ্গেরির সেরা ফুটবলারদের, হনভেদ ক্লাবে যোগ দিতে। একে একে সেখানে এসে পৌঁছন ফেরেঙ্ক পুসকাস, জোল্টান জিবর, স্যান্ডর ককসিস, ন্যান্ডর হিদেকুটি ও গোলরক্ষক গিউলা গ্রসিকস। তৈরি হয় সেরা ফুটবল দলের নিউক্লিয়াস।
১৯৫২ হেলসিঙ্কে অলিম্পিক তাঁদের ‘আয়রন কার্টেন’–এর বাইরে প্রথম বড় প্রতিযোগিতা। সেখানে সেমিফাইনালে সুইডেন ও ফাইনালে যুগোস্লাভিয়াকে হারিয়ে সোনা। তার পরের বছর রোমে সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান কাপে ইতালিকে ৩–০ হারানোর পর হাঙ্গেরিকে সেরা না–ধরে আর উপায় ছিল না।
ধনাত্মক হোক বা ঋণাত্মক, গত শতাব্দীর পাঁচের দশক ফুটবল–ভাবনায় সংপৃক্ত। হাঙ্গেরি, ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’, যদি ইতিবাচকতার অন্যতম সীমা হয়, অস্ট্রিয়ার‘ভিয়েনিজ’ ফুটবল যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর কথা ভাবতে পারে, সেই অস্ট্রিয়ারই কার্ল রাপ্পান সুইটজারল্যান্ডে গিয়ে ফুটবলকে দিয়ে ফেলতে পারেন নেতিবাচকতার চরম রূপ— সুইস–বোল্ট।
না, রক্ষণাত্মক ভাবনা মানেই নেতিবাচকতা নয়। গোল করা ফুটবলে সবচেয়ে বড় কাজ হলে গোল আটকানো খুব পিছিয়ে থাকবে না। চার গোল দিলেও পাঁচ গোল খেলে ফুটবলের কোনও বিরাট উপকার সাধিত হয় না, ঠিক। আসলে কাজ তো আর নেতিবাচক হয় না, হয় উদ্দেশ্য। কী কারণে কাজ করা হচ্ছে, ঠিক করে দেয় কাজের ধরণ।
রক্ষণাত্মক হওয়া নেতিবাচক হলে ফুটবলে প্রথম ঋণাত্মক ভাবনার কারিগর হারবার্ট চ্যাপম্যান। কিন্তু, চ্যাপম্যানের ‘থার্ড ব্যাক’ ছিল প্রয়োজনীয়তা। তিনের দশকে স্যার অ্যালেক্স জেমস আসার পর আর্সেনালের যে প্রাধান্য ইংরেজ লিগ দেখেছিল, থার্ড ব্যাকের প্রয়োজনীয়তা বুঝেছিল ফুটবল বিশ্ব।
থার্ড ব্যাক আসলে ট্যাকটিকাল চিন্তা। বিপক্ষের সেন্টার ফরোয়ার্ড নিজের দলের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে একবার পেরিয়ে গেলে ডিফেন্সিভ থার্ডে যে রাজত্ব করে, ‘টপ হেভি’ এম–ডব্লু ফর্মেশনের সেই দুর্বলতা কাটাতে চ্যাপম্যানের সে সময়ের যুগান্তকারী ভাবনা, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে একটু নিচে নামিয়ে বিপক্ষের সেন্টার ফরোয়ার্ডকে আটকানোর দায়িত্ব দেওয়া, দুই ব্যাক দুপাশে সরে গিয়ে দুই ইনসাইড ফরোয়ার্ডকে ধরবে আর সেন্টার ফরোয়ার্ড খেলবে একটু নিচে। অর্থাৎ, ফুটবল–পাঠক ভাবলেই বুঝবেন, প্রকৃতপক্ষে চ্যাপম্যান তখনই খেলিয়েছিলেন ৩–৩–৪। তখন ব্রিটিশরা এত কিছু বোঝেনি। ডিফেন্সে তিন জন দেখে তাঁরা লিখতে শুরু করে ৩–২–৫। এই যে আগের (২–৩–৫) দুজন ব্যাক থেকে বেড়ে তৃতীয় ব্যাক এল মাঝমাঠ থেকে, কমে গেল এক মিডফিল্ডার, নাম হল ‘থার্ড ব্যাক’। খেলা আরও জমাট হল, খুলে গেল নতুন ভাবনার সূত্র।
রাপ্পানের সুইস–বোল্ট সে তুলনায় একেবারেই আলাদা। মার্কারের সঙ্গে সম্পর্কে ‘তুমি নাট, আমি বল্টু’, যেন ইস্টবেঙ্গলের জীবন–পল্টু! যাঁকে মার্ক করা হচ্ছে,সাইডলাইনের ধারে জল খেতে গিয়েও দেখছে, পেছনে মার্কার, যার চরম সীমায় পৌঁছতে চেয়ে বলা হয়েছিল, ‘তুমি বাথরুমে তো আমিও’! ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস,হাত–পা সমানে চলছে, বিরক্তি, শুধু বিরক্তিতে খেলা ভুলে যেতে বাধ্য গেমমেকার, লাভ রাপ্পানের, ফুটবলের লোকসান। রাপ্পান ঋণাত্মক, কারণ, তাঁর স্ট্র্যাটেজি আঘাত হেনেছিল খেলার ওপর, সামগ্রিক খেলাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রাপ্পান চেয়েও ছিলেন তাই, খেলার ছন্দ নষ্ট করতে। তাঁর বোল্ট ডিফেন্স গোল দেওয়া বা আটকানো কোনও উদ্দেশ্য নিয়েই নয়, শুধুই খেলাটাকে শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, তাই নেতিবাচক। ধ্বংসাত্মক চিন্তায় সুইস–বোল্ট এগিয়ে কাতানেচিও–র চেয়েও।
ভাবতেও অবাক লাগে হাঙ্গেরি কী করে সেই সময় ২০ বছর পরের প্রেসিং ফুটবলের প্রাথমিক পাঠ দিয়েছিল বিশ্বকে।
আসলে, কোচদের সুদূরপ্রসারী ভাবনা সর্থক রূপ পেয়েছে তখনই, হাতে যখন অন্তত চারজন এমন ফুটবলার, টেকনিকালি সম্পূর্ণ এবং ট্যাকটিকালি ওয়াকিবহাল। নতুন চিন্তাকে রক্তমাংসের আকার দিতে সক্ষম। গুস্তাভ সেবেস, হাঙ্গেরির সেই ফুটবল দলের সর্বময় কর্তার কাজ তুলনায় সহজ হয়ে গিয়েছিল যাঁদের পেয়ে — গোলে গ্রসিকস, রক্ষণে বজসিক, মাঝমাঠে ককসিস–হিদেকুটি আর ওপরে ‘গ্যালপিং মেজর’ ফেরেঙ্ক পুসকাস, সঙ্গে আবার জিবর। এমন দল নিয়েই তো ‘ট্যাকটিকাল ইনোভেশন’ সম্ভব!
কী করেছিল হাঙ্গেরি বলার চেয়ে সহজ, কী করেনি! ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ড অপরাজিত তো বটেই, অপরাজেয়ও ছিল। সেই ইংল্যান্ডকে ওয়েম্বলিতে হারিয়েছিল ৬–৩, পরে বুদাপেস্টে ৭–১। ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুই ক্ষত। ফুটবলে ট্রাজেডি বলতে এখনও ইংরেজরা ওই দুই পরাজয়ের কথাই ভাবে, আর আতঙ্কিত হয়,অধোবদন হয় লজ্জায়।

উইলি মেজল, অস্ট্রিয়ার ‘ওয়ান্ডারটিম’ তৈরির কারিগর উগো মেজল–এর ভাই যিনি পরে ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন, ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস–এর ফরেন এডিটর এবং ব্রিটিশ ফুটবলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বহু দশকের অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করে দিয়েছেন তাঁর ‘সকার রেভলিউশন’ বইতে। ইংল্যান্ডের এই দুই লজ্জাজনক হার প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য —
‘The so-called speed by which the Hungarians defeated the Englishmen and made them look ridiculous for long stretches, was not one of legs, but originated in the cerebral part of their anatomy. Players of perfect technique and in full possession of their individualities, their fancy and fantasy bridled but not extinguished, beat our quite fast, well-conditioned, but unimaginative soccer-robots. Our capacity for witty soccer-banter, for quick reaction, has been carefully and persistently trained away through about a quarter of a century. If we want to sum up the lessons from the two Hungarian games, it can be done in three words: Brain beat brawn.’
হাঙ্গেরির ফুটবল আসলে নিজেদের উন্নীত করেছিল, ‘something beyond a Saturday afternoon pastime’, ইংরেজদের পক্ষে যার ঠিকানা খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না, পায়ওনি। সান্ত্বনা খুঁজেছিল এই ঠুনকো আত্মপক্ষ সমর্থনে যে, ওরা ওদের মতো, আমরা আমাদের মতো, আমাদের পক্ষে যেমন ওদের ধরা সম্ভব নয়, ওরাও পারবে না প্রতি শনিবারের এই ব্রিটিশ লিগের ধকল নিতে। অর্থাৎ, সেই একবগ্গা ‘আমরাই সেরা’ মনোভাব, অমন হার থেকেও শিক্ষা নেব না, রক্ষণশীলতার অনমনীয়তা!
‘ডিপ লাইং সেন্টার ফরোয়ার্ড’ ছিলেন হিদেকুটি। তখন সেন্টার ফরোয়ার্ড যেখানে দাঁড়াতেন, হিদেকুটি খেলতেন তার চেয়ে পেছন থেকে। ফলে, তাঁকে মার্ক করা বিশ্বের তাবড় দলগুলোর কাছেও বিভীষিকা। আরও একটু এগিয়ে ভাবলে, ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল বিশ্বকে যে ৪–২–৪ দিয়ে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল তারই প্রাথমিক রূপ।
অবশ্য এখানেই শেষ নয়। আরও কুড়ি বছর পর বিশ্বকাপ পেয়েছিল রাইনাস মিশেলের প্রেসিং ফুটবল যার প্রাথমিক পাঠও ছিল হাঙ্গেরির সেই ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্সের পায়ে। ‘পজিশনাল ফ্লুইডিটি’–র বাংলা ঠিক কী হবে, জানা নেই, কিন্তু, হাঙ্গেরীয়রা বাজিমাত করে গিয়েছিলেন সেই সময় ওই ‘পজিশনাল ফ্লুইডিটি’–র জোরে। তখনকার কোনও দলই যে–ভাবনা ভাবতেও পারেনি। ছিল গুলিয়ে–দেওয়া প্রসঙ্গও। সেই সময় ফুটবলারদের জার্সি নম্বর খুব জরুরি ছিল, যে–ফুটবলার যেখানে দাঁড়াতেন তাঁর জার্সির নম্বর ঠিক হত সেইভাবে। মানে, সাত নম্বরকে রাইট উইঙ্গার হতেই হবে, ইত্যাদি। তো, হাঙ্গেরি সেই নিয়ম মানেনি। ফলে, বিপক্ষ আরও ধাঁধায়, কত নম্বরকে কোথায় মার্ক করা হবে বুঝতে বুঝতেই খেলা শেষ।
যুগের তুলনায় এত এগিয়ে ছিল বলেই সেই দলের সাফল্যের খতিয়ান — ৫০ ম্যাচে ৪২ জয়, ৭ ড্র। সঙ্গে, ওই ৫০ ম্যাচে ২১৫ গোল, মানে ম্যাচ–প্রতি ৪.৩ গোল করে! ফুটবল–ঐতিহাসিকরা একমত, এমন দল ফুটবলে আসেনি।
প্রাথমিক পর্ব
শেষ ৩০ ম্যাচে অপরাজিত, মোট গোল ১২১!
হাঙ্গেরি এমন রেকর্ড নিয়ে পৌঁছেছিল বিশ্বকাপে। এবং সেই রেকর্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রথম দু’ম্যাচে ১৭ গোল দিয়েছিল যার ৮ গোল পশ্চিম জার্মানিকে।
এই দলকে রোখা সম্ভব কিনা, ভাবা শুরু বিশ্বের। কিন্তু, একজন নিশ্চিত ছিলেন রোখা সম্ভব। শেপ হারবারজার, পশ্চিম জার্মানির কোচ। গ্রুপ লিগে তাঁর দলের সঙ্গেই ছিল হাঙ্গেরি। হিটলারের দেশের লোকের মস্তিষ্ক বলে দিয়েছিল উপায়। রিজার্ভ বেঞ্চের সাতজন ফুটবলারকে নামিয়েছিলেন গ্রুপ লিগের সেই ম্যাচে। আর সেন্টার হাফ লিয়েবরিখকে দিয়েছিলেন আসল কাজের ভার। সুচারু ভঙ্গিতে সেই কাজ করে গেলেন লিয়েবরিখ। পুসকাসকে এমন ট্যাকল করলেন, সোজা ম্যাচের বাইরে। আসলে,প্রতিযোগিতারই বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জার্মান সেন্টার হাফ। পুসকাস তারপর খেলতে নেমেছিলেন একেবারে ফাইনালে, তা–ও জোর করেই।
এবং, এই প্রশ্নও উঠেছে, আলোচনা চলছে বহু জায়গায়, জার্মানরা কি ইচ্ছে করেই হেরেছিল ওই ম্যাচটা? কেনই বা বিশ্বকাপের আসরে এত বড় ব্যবধানে হারবে? কিন্তু,যাদের লক্ষ্য উঁচুতে, প্রতিযোগিতার শুরুতে এমন একটা ম্যাচ হারলে যখন জানাই থাকছে যে বিরাট কোনও পার্থক্য হবে না, কী দরকার হাঙ্গেরিকে বুঝতে দিয়ে যে কতটা তৈরি তাঁরা? তা ছাড়া, দ্বিতীয় দল নামানোর আসল উদ্দেশ্য তো পুসকাসকে মেরে প্রতিযোগিতার বাইরে করে দেওয়া, তা করা গেলেই তো হল! তাই পরের ম্যাচে জুরিখে জার্মানি দলে সাতজন ‘নতুন’ ফুটবলার এবং জয় ৭–১ ব্যবধানে! কোনও চিহ্নই নেই হাঙ্গেরির কাছে ৩–৮ হারের।
ইংল্যান্ডের শুরু ৪–৪, বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে। পরের ম্যাচে সুইটজারল্যান্ডকে হারানো ২–০। প্রথম ম্যাচে স্যর স্ট্যানলি ম্যাথুজ ছিলেন। এবারও তাঁকে ছাড়াই দল বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রথমে। কিন্তু, শেষ মুহূর্তে ডেকে পাঠানো হয় এবং বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাথুজ ছিলেন স্বমহিমায়। উরুগুয়ের কোনও অসুবিধেই হয়নি কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছতে। ভারেলা, আন্দ্রাদে, সিয়াফিনো — গতবারের চ্যাম্পিয়নদের তিন সেরা তারকাই ছিলেন, নতুন এসেছিলেন আব্বাদি। প্রথমে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারানো ২–০, পরের ম্যাচে স্কটল্যান্ড স্রেফ উড়ে গিয়েছিল ৭–১।
মারাকানার বিপর্যয়ের পর বছর দুই আর মারাকানায় খেলেনি, আর জীবনে কখনও সাদা জার্সিতেও খেলেনি ব্রাজিল। কিন্তু, চুয়ান্নর বিশ্বকাপে হোসে মোরেইরার প্রশিক্ষণে, দলে প্রচুর নতুন মুখ নিয়ে এসেছিল ব্রাজিল। পঞ্চাশের সেরা ত্রয়ী জিজিনিও–আদেমির–জেয়ার ছিলেন না। সানতোস–ভায়েরা, জালমা ও নিলতন উঠে এসেছিলেন। সঙ্গে দিদি, বালতাজার ও জুলিনিও, ছিলেন পঞ্চাশের অধিনায়ক বাউয়ারও। মেহিকো উড়ে গিয়েছিল ৫–১, কিন্তু যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ১–১ আটকে গিয়েছিল ব্রাজিল।
কোয়ার্টার ফাইনাল
অস্ট্রিয়া–সুইটজারল্যান্ড এই বিশ্বকাপের তো বটেই, বোধহয় সর্বকালের সেরা ম্যাচগুলোর তালিকাতেও জায়গা পেয়ে যাবে স্রেফ স্কোরলাইনের জন্য! ৭–৫ এবং তা টাইব্রেকারে নয়। টাইব্রেকার তখন কোথায়? আয়োজক সুইটজারল্যান্ড ৩–০ এগিয়ে গিয়েছিল ১৬, ১৭, ১৮ এই তিন মিনিটে তিন গোল করে। ২৫, ২৬, ২৮, ৩২ ও ৩৪ মিনিটে অস্ট্রিয়া এগিয়ে ৫–৩! ৩৬ মিনিটে ৫–৫, বিরতির ঠিক আগে অস্ট্রিয়ার কোরনার আবার পেনাল্টি মিস করেন, শেষ পর্যন্ত ৭–৫। কিন্তু, সবার চেয়ে বড় যা, সুইস অধিনায়ক রজার বোকে–র এই ম্যাচে খেলা। বহুদিন ধরেই টিউমারের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন বোকে। খেলার পরই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। নিজেই বলেছিলেন সাজঘরে, ‘খেলতে চাই ম্যাচটা। পরে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর অপারেশন এবং বেঁচে থাকব কিনা, জানি না।’ এই কথার পর আর কেউ কোনও কথাই বলতে পারেননি। বোকে নিজের প্রজন্মের সেরা ফুটবলারের সম্মান পেতেন। ম্যাচেও জান দিয়েই খেলেছিলেন,
সুইটজারল্যান্ডে উদ্ভুত এই অদ্ভুত সত্যে প্রমাণের সিলমোহর পড়েছিল আরও ২০ বছর পর, জার্মানিতে। এবং, কী আশ্চর্য, দুবারই স্বপ্ন খুনের আসামী পশ্চিম জার্মানি!
এলো রেটিং–এ ১৯৫৪–র হাঙ্গেরি ১৯৭০–এর ব্রাজিলেরও আগে!
না, ছাপার ভুল নয়। এলো রেটিং দাবায় থাকে, পাঁচবারের দাবা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের দেশের মানুষেরও জানা কথা। তা হলে, ফুটবলে সে প্রসঙ্গ কেন এল?
হাঙ্গেরীয় অঙ্কবিদ ড. অ্যারপ্যাড এলো সৃষ্ট র্যাঙ্কিং সিস্টেম মেনে চলে বিশ্ব দাবা সংস্থা ফিডে। সেই এলো রেটিং–কে ফুটবলের জন্য ব্যবহার করেছিলেন প্রথম বব রুনিয়ান, ১৯৯৭ সালে। এখন ফিফার বিশ্ব র্যাঙ্কিং–এর মতো প্রচলিত না হলেও, ফুটবলের এলো রেটিং–ও যথেষ্ট জনপ্রিয়। ফুটবল–উৎসাহী পাঠক ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন ইন্টারনেটে।
যাক গে, এলাটিং বেলাটিং সই লো, এলো রেটিং–ও রইল, আপাতত, ফেরা যাক হাঙ্গেরিতে।
হাঙ্গেরির বিপ্লব ১৯৫৬ সালে। কিন্তু, হাঙ্গেরিয়ান ফুটবলের বিপ্লব তারও আট বছর আগে। ১৯৪৮ সালে যখন সে দেশের কমিউনিস্ট সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল‘সোশ্যালিস্ট ফুটবল’–এর স্বরূপ দেখাতে হবে বহির্বিশ্বকে। ডেপুটি স্পোর্টস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন বুদাপেস্তের প্রাক্তন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা গুস্তাভ সেবেস। তিনিই নির্দেশ দিয়েছিলেন, হাঙ্গেরির সেরা ফুটবলারদের, হনভেদ ক্লাবে যোগ দিতে। একে একে সেখানে এসে পৌঁছন ফেরেঙ্ক পুসকাস, জোল্টান জিবর, স্যান্ডর ককসিস, ন্যান্ডর হিদেকুটি ও গোলরক্ষক গিউলা গ্রসিকস। তৈরি হয় সেরা ফুটবল দলের নিউক্লিয়াস।
১৯৫২ হেলসিঙ্কে অলিম্পিক তাঁদের ‘আয়রন কার্টেন’–এর বাইরে প্রথম বড় প্রতিযোগিতা। সেখানে সেমিফাইনালে সুইডেন ও ফাইনালে যুগোস্লাভিয়াকে হারিয়ে সোনা। তার পরের বছর রোমে সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান কাপে ইতালিকে ৩–০ হারানোর পর হাঙ্গেরিকে সেরা না–ধরে আর উপায় ছিল না।
ধনাত্মক হোক বা ঋণাত্মক, গত শতাব্দীর পাঁচের দশক ফুটবল–ভাবনায় সংপৃক্ত। হাঙ্গেরি, ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স’, যদি ইতিবাচকতার অন্যতম সীমা হয়, অস্ট্রিয়ার‘ভিয়েনিজ’ ফুটবল যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও মাথা তুলে দাঁড়ানোর কথা ভাবতে পারে, সেই অস্ট্রিয়ারই কার্ল রাপ্পান সুইটজারল্যান্ডে গিয়ে ফুটবলকে দিয়ে ফেলতে পারেন নেতিবাচকতার চরম রূপ— সুইস–বোল্ট।
না, রক্ষণাত্মক ভাবনা মানেই নেতিবাচকতা নয়। গোল করা ফুটবলে সবচেয়ে বড় কাজ হলে গোল আটকানো খুব পিছিয়ে থাকবে না। চার গোল দিলেও পাঁচ গোল খেলে ফুটবলের কোনও বিরাট উপকার সাধিত হয় না, ঠিক। আসলে কাজ তো আর নেতিবাচক হয় না, হয় উদ্দেশ্য। কী কারণে কাজ করা হচ্ছে, ঠিক করে দেয় কাজের ধরণ।
রক্ষণাত্মক হওয়া নেতিবাচক হলে ফুটবলে প্রথম ঋণাত্মক ভাবনার কারিগর হারবার্ট চ্যাপম্যান। কিন্তু, চ্যাপম্যানের ‘থার্ড ব্যাক’ ছিল প্রয়োজনীয়তা। তিনের দশকে স্যার অ্যালেক্স জেমস আসার পর আর্সেনালের যে প্রাধান্য ইংরেজ লিগ দেখেছিল, থার্ড ব্যাকের প্রয়োজনীয়তা বুঝেছিল ফুটবল বিশ্ব।
থার্ড ব্যাক আসলে ট্যাকটিকাল চিন্তা। বিপক্ষের সেন্টার ফরোয়ার্ড নিজের দলের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে একবার পেরিয়ে গেলে ডিফেন্সিভ থার্ডে যে রাজত্ব করে, ‘টপ হেভি’ এম–ডব্লু ফর্মেশনের সেই দুর্বলতা কাটাতে চ্যাপম্যানের সে সময়ের যুগান্তকারী ভাবনা, সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে একটু নিচে নামিয়ে বিপক্ষের সেন্টার ফরোয়ার্ডকে আটকানোর দায়িত্ব দেওয়া, দুই ব্যাক দুপাশে সরে গিয়ে দুই ইনসাইড ফরোয়ার্ডকে ধরবে আর সেন্টার ফরোয়ার্ড খেলবে একটু নিচে। অর্থাৎ, ফুটবল–পাঠক ভাবলেই বুঝবেন, প্রকৃতপক্ষে চ্যাপম্যান তখনই খেলিয়েছিলেন ৩–৩–৪। তখন ব্রিটিশরা এত কিছু বোঝেনি। ডিফেন্সে তিন জন দেখে তাঁরা লিখতে শুরু করে ৩–২–৫। এই যে আগের (২–৩–৫) দুজন ব্যাক থেকে বেড়ে তৃতীয় ব্যাক এল মাঝমাঠ থেকে, কমে গেল এক মিডফিল্ডার, নাম হল ‘থার্ড ব্যাক’। খেলা আরও জমাট হল, খুলে গেল নতুন ভাবনার সূত্র।
রাপ্পানের সুইস–বোল্ট সে তুলনায় একেবারেই আলাদা। মার্কারের সঙ্গে সম্পর্কে ‘তুমি নাট, আমি বল্টু’, যেন ইস্টবেঙ্গলের জীবন–পল্টু! যাঁকে মার্ক করা হচ্ছে,সাইডলাইনের ধারে জল খেতে গিয়েও দেখছে, পেছনে মার্কার, যার চরম সীমায় পৌঁছতে চেয়ে বলা হয়েছিল, ‘তুমি বাথরুমে তো আমিও’! ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস,হাত–পা সমানে চলছে, বিরক্তি, শুধু বিরক্তিতে খেলা ভুলে যেতে বাধ্য গেমমেকার, লাভ রাপ্পানের, ফুটবলের লোকসান। রাপ্পান ঋণাত্মক, কারণ, তাঁর স্ট্র্যাটেজি আঘাত হেনেছিল খেলার ওপর, সামগ্রিক খেলাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। রাপ্পান চেয়েও ছিলেন তাই, খেলার ছন্দ নষ্ট করতে। তাঁর বোল্ট ডিফেন্স গোল দেওয়া বা আটকানো কোনও উদ্দেশ্য নিয়েই নয়, শুধুই খেলাটাকে শেষ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে, তাই নেতিবাচক। ধ্বংসাত্মক চিন্তায় সুইস–বোল্ট এগিয়ে কাতানেচিও–র চেয়েও।
ভাবতেও অবাক লাগে হাঙ্গেরি কী করে সেই সময় ২০ বছর পরের প্রেসিং ফুটবলের প্রাথমিক পাঠ দিয়েছিল বিশ্বকে।
আসলে, কোচদের সুদূরপ্রসারী ভাবনা সর্থক রূপ পেয়েছে তখনই, হাতে যখন অন্তত চারজন এমন ফুটবলার, টেকনিকালি সম্পূর্ণ এবং ট্যাকটিকালি ওয়াকিবহাল। নতুন চিন্তাকে রক্তমাংসের আকার দিতে সক্ষম। গুস্তাভ সেবেস, হাঙ্গেরির সেই ফুটবল দলের সর্বময় কর্তার কাজ তুলনায় সহজ হয়ে গিয়েছিল যাঁদের পেয়ে — গোলে গ্রসিকস, রক্ষণে বজসিক, মাঝমাঠে ককসিস–হিদেকুটি আর ওপরে ‘গ্যালপিং মেজর’ ফেরেঙ্ক পুসকাস, সঙ্গে আবার জিবর। এমন দল নিয়েই তো ‘ট্যাকটিকাল ইনোভেশন’ সম্ভব!
কী করেছিল হাঙ্গেরি বলার চেয়ে সহজ, কী করেনি! ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ড অপরাজিত তো বটেই, অপরাজেয়ও ছিল। সেই ইংল্যান্ডকে ওয়েম্বলিতে হারিয়েছিল ৬–৩, পরে বুদাপেস্টে ৭–১। ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুই ক্ষত। ফুটবলে ট্রাজেডি বলতে এখনও ইংরেজরা ওই দুই পরাজয়ের কথাই ভাবে, আর আতঙ্কিত হয়,অধোবদন হয় লজ্জায়।

উইলি মেজল, অস্ট্রিয়ার ‘ওয়ান্ডারটিম’ তৈরির কারিগর উগো মেজল–এর ভাই যিনি পরে ইংল্যান্ডের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন, ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস–এর ফরেন এডিটর এবং ব্রিটিশ ফুটবলের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বহু দশকের অভিজ্ঞতার ঝুলি উপুড় করে দিয়েছেন তাঁর ‘সকার রেভলিউশন’ বইতে। ইংল্যান্ডের এই দুই লজ্জাজনক হার প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য —
‘The so-called speed by which the Hungarians defeated the Englishmen and made them look ridiculous for long stretches, was not one of legs, but originated in the cerebral part of their anatomy. Players of perfect technique and in full possession of their individualities, their fancy and fantasy bridled but not extinguished, beat our quite fast, well-conditioned, but unimaginative soccer-robots. Our capacity for witty soccer-banter, for quick reaction, has been carefully and persistently trained away through about a quarter of a century. If we want to sum up the lessons from the two Hungarian games, it can be done in three words: Brain beat brawn.’
হাঙ্গেরির ফুটবল আসলে নিজেদের উন্নীত করেছিল, ‘something beyond a Saturday afternoon pastime’, ইংরেজদের পক্ষে যার ঠিকানা খুঁজে পাওয়া সম্ভব ছিল না, পায়ওনি। সান্ত্বনা খুঁজেছিল এই ঠুনকো আত্মপক্ষ সমর্থনে যে, ওরা ওদের মতো, আমরা আমাদের মতো, আমাদের পক্ষে যেমন ওদের ধরা সম্ভব নয়, ওরাও পারবে না প্রতি শনিবারের এই ব্রিটিশ লিগের ধকল নিতে। অর্থাৎ, সেই একবগ্গা ‘আমরাই সেরা’ মনোভাব, অমন হার থেকেও শিক্ষা নেব না, রক্ষণশীলতার অনমনীয়তা!
‘ডিপ লাইং সেন্টার ফরোয়ার্ড’ ছিলেন হিদেকুটি। তখন সেন্টার ফরোয়ার্ড যেখানে দাঁড়াতেন, হিদেকুটি খেলতেন তার চেয়ে পেছন থেকে। ফলে, তাঁকে মার্ক করা বিশ্বের তাবড় দলগুলোর কাছেও বিভীষিকা। আরও একটু এগিয়ে ভাবলে, ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল বিশ্বকে যে ৪–২–৪ দিয়ে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল তারই প্রাথমিক রূপ।
অবশ্য এখানেই শেষ নয়। আরও কুড়ি বছর পর বিশ্বকাপ পেয়েছিল রাইনাস মিশেলের প্রেসিং ফুটবল যার প্রাথমিক পাঠও ছিল হাঙ্গেরির সেই ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্সের পায়ে। ‘পজিশনাল ফ্লুইডিটি’–র বাংলা ঠিক কী হবে, জানা নেই, কিন্তু, হাঙ্গেরীয়রা বাজিমাত করে গিয়েছিলেন সেই সময় ওই ‘পজিশনাল ফ্লুইডিটি’–র জোরে। তখনকার কোনও দলই যে–ভাবনা ভাবতেও পারেনি। ছিল গুলিয়ে–দেওয়া প্রসঙ্গও। সেই সময় ফুটবলারদের জার্সি নম্বর খুব জরুরি ছিল, যে–ফুটবলার যেখানে দাঁড়াতেন তাঁর জার্সির নম্বর ঠিক হত সেইভাবে। মানে, সাত নম্বরকে রাইট উইঙ্গার হতেই হবে, ইত্যাদি। তো, হাঙ্গেরি সেই নিয়ম মানেনি। ফলে, বিপক্ষ আরও ধাঁধায়, কত নম্বরকে কোথায় মার্ক করা হবে বুঝতে বুঝতেই খেলা শেষ।
যুগের তুলনায় এত এগিয়ে ছিল বলেই সেই দলের সাফল্যের খতিয়ান — ৫০ ম্যাচে ৪২ জয়, ৭ ড্র। সঙ্গে, ওই ৫০ ম্যাচে ২১৫ গোল, মানে ম্যাচ–প্রতি ৪.৩ গোল করে! ফুটবল–ঐতিহাসিকরা একমত, এমন দল ফুটবলে আসেনি।
প্রাথমিক পর্ব
শেষ ৩০ ম্যাচে অপরাজিত, মোট গোল ১২১!
হাঙ্গেরি এমন রেকর্ড নিয়ে পৌঁছেছিল বিশ্বকাপে। এবং সেই রেকর্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রথম দু’ম্যাচে ১৭ গোল দিয়েছিল যার ৮ গোল পশ্চিম জার্মানিকে।
এই দলকে রোখা সম্ভব কিনা, ভাবা শুরু বিশ্বের। কিন্তু, একজন নিশ্চিত ছিলেন রোখা সম্ভব। শেপ হারবারজার, পশ্চিম জার্মানির কোচ। গ্রুপ লিগে তাঁর দলের সঙ্গেই ছিল হাঙ্গেরি। হিটলারের দেশের লোকের মস্তিষ্ক বলে দিয়েছিল উপায়। রিজার্ভ বেঞ্চের সাতজন ফুটবলারকে নামিয়েছিলেন গ্রুপ লিগের সেই ম্যাচে। আর সেন্টার হাফ লিয়েবরিখকে দিয়েছিলেন আসল কাজের ভার। সুচারু ভঙ্গিতে সেই কাজ করে গেলেন লিয়েবরিখ। পুসকাসকে এমন ট্যাকল করলেন, সোজা ম্যাচের বাইরে। আসলে,প্রতিযোগিতারই বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন জার্মান সেন্টার হাফ। পুসকাস তারপর খেলতে নেমেছিলেন একেবারে ফাইনালে, তা–ও জোর করেই।
এবং, এই প্রশ্নও উঠেছে, আলোচনা চলছে বহু জায়গায়, জার্মানরা কি ইচ্ছে করেই হেরেছিল ওই ম্যাচটা? কেনই বা বিশ্বকাপের আসরে এত বড় ব্যবধানে হারবে? কিন্তু,যাদের লক্ষ্য উঁচুতে, প্রতিযোগিতার শুরুতে এমন একটা ম্যাচ হারলে যখন জানাই থাকছে যে বিরাট কোনও পার্থক্য হবে না, কী দরকার হাঙ্গেরিকে বুঝতে দিয়ে যে কতটা তৈরি তাঁরা? তা ছাড়া, দ্বিতীয় দল নামানোর আসল উদ্দেশ্য তো পুসকাসকে মেরে প্রতিযোগিতার বাইরে করে দেওয়া, তা করা গেলেই তো হল! তাই পরের ম্যাচে জুরিখে জার্মানি দলে সাতজন ‘নতুন’ ফুটবলার এবং জয় ৭–১ ব্যবধানে! কোনও চিহ্নই নেই হাঙ্গেরির কাছে ৩–৮ হারের।
ইংল্যান্ডের শুরু ৪–৪, বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে। পরের ম্যাচে সুইটজারল্যান্ডকে হারানো ২–০। প্রথম ম্যাচে স্যর স্ট্যানলি ম্যাথুজ ছিলেন। এবারও তাঁকে ছাড়াই দল বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রথমে। কিন্তু, শেষ মুহূর্তে ডেকে পাঠানো হয় এবং বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাথুজ ছিলেন স্বমহিমায়। উরুগুয়ের কোনও অসুবিধেই হয়নি কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছতে। ভারেলা, আন্দ্রাদে, সিয়াফিনো — গতবারের চ্যাম্পিয়নদের তিন সেরা তারকাই ছিলেন, নতুন এসেছিলেন আব্বাদি। প্রথমে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারানো ২–০, পরের ম্যাচে স্কটল্যান্ড স্রেফ উড়ে গিয়েছিল ৭–১।
মারাকানার বিপর্যয়ের পর বছর দুই আর মারাকানায় খেলেনি, আর জীবনে কখনও সাদা জার্সিতেও খেলেনি ব্রাজিল। কিন্তু, চুয়ান্নর বিশ্বকাপে হোসে মোরেইরার প্রশিক্ষণে, দলে প্রচুর নতুন মুখ নিয়ে এসেছিল ব্রাজিল। পঞ্চাশের সেরা ত্রয়ী জিজিনিও–আদেমির–জেয়ার ছিলেন না। সানতোস–ভায়েরা, জালমা ও নিলতন উঠে এসেছিলেন। সঙ্গে দিদি, বালতাজার ও জুলিনিও, ছিলেন পঞ্চাশের অধিনায়ক বাউয়ারও। মেহিকো উড়ে গিয়েছিল ৫–১, কিন্তু যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ১–১ আটকে গিয়েছিল ব্রাজিল।
কোয়ার্টার ফাইনাল
অস্ট্রিয়া–সুইটজারল্যান্ড এই বিশ্বকাপের তো বটেই, বোধহয় সর্বকালের সেরা ম্যাচগুলোর তালিকাতেও জায়গা পেয়ে যাবে স্রেফ স্কোরলাইনের জন্য! ৭–৫ এবং তা টাইব্রেকারে নয়। টাইব্রেকার তখন কোথায়? আয়োজক সুইটজারল্যান্ড ৩–০ এগিয়ে গিয়েছিল ১৬, ১৭, ১৮ এই তিন মিনিটে তিন গোল করে। ২৫, ২৬, ২৮, ৩২ ও ৩৪ মিনিটে অস্ট্রিয়া এগিয়ে ৫–৩! ৩৬ মিনিটে ৫–৫, বিরতির ঠিক আগে অস্ট্রিয়ার কোরনার আবার পেনাল্টি মিস করেন, শেষ পর্যন্ত ৭–৫। কিন্তু, সবার চেয়ে বড় যা, সুইস অধিনায়ক রজার বোকে–র এই ম্যাচে খেলা। বহুদিন ধরেই টিউমারের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন বোকে। খেলার পরই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। নিজেই বলেছিলেন সাজঘরে, ‘খেলতে চাই ম্যাচটা। পরে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর অপারেশন এবং বেঁচে থাকব কিনা, জানি না।’ এই কথার পর আর কেউ কোনও কথাই বলতে পারেননি। বোকে নিজের প্রজন্মের সেরা ফুটবলারের সম্মান পেতেন। ম্যাচেও জান দিয়েই খেলেছিলেন,
Enjoyed looking through this, very good stuff, regards. http://grsultras.net/
ReplyDelete