বেঙ্গালুরু পরাস্ত বারাসতে, রবিনের গোলে ভরসা ইস্টবেঙ্গলে
ইস্টবেঙ্গল - ২ বেঙ্গালুরু – ১
(বুকেনিয়া ২৮, রবিন ৭৯) (বিনীত ২৩)
কাশীনাথ ভট্টাচার্য
স্কোরবোর্ডকে ‘গাধা’ বলা হয় ক্রিকেটে। ফুটবলে স্কোরলাইনও অনেক সময়ই ম্যাচে দাপটের প্রতিফলন ঠিকঠাক দেখায় না। আই লিগের ইতিহাসে রবিবার বারাসতের বিদ্যাসাগর ক্রীড়াঙ্গন দেখল তেমনই ছবি। স্কোরলাইন বলছে এক গোলের ব্যবধানে জিতল ইস্টবেঙ্গল। আদপে, ব্যবধান চার-পাঁচ গোলের হতেই পারত। দ্বিতীয়ার্ধে রবিন সিং মাঠে আসার পর ইস্টবেঙ্গলের ‘দৌরাত্ম্য’ দেখল মাঠভর্তি হাজার পনের-র লালহলুদ গ্যালারি। ইডেন ছেড়ে বারাসতে এসে যারা পেলেন কাঙ্ক্ষিত জয়। ত্রিনিদাদের উইলিস প্লাজা আই লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যেতে পারতেন। ফিরলেন শূন্য হাতে!
ইস্টবেঙ্গল কোচ দল সাজিয়েছিলেন ৪-৩-২-১ ছকে। একা প্লাজাকে ওপরে রেখে আর নতুন বিদেশি আমিরভকে শুরুতে এনে। কিন্তু, আমিরভ চূড়ান্ত ফ্লপ বললেও কম। বলই ধরেননি প্রায়। ট্রেভর জেমস মর্গ্যান দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তাই আমিরভকে তুলে রবিনকে মাঠে আনেন। পাল্টে যায় ম্যাচের ছবি!
কী করলেন রবিন? তাঁর বড় চেহারার নড়াচড়া বেঙ্গালুরুর বিশ্বস্ত ডিপ ডিফেন্ডার জুটি জন জনসন আর খুয়ান আন্তোনিও ফেনানদেজ-এর মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব তৈরি করল। দুজন খুব কাছাকাছি এসে যাওয়ায় দুই সাইডব্যাক রালতে ও খাবড়ার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ল। সেই ফাঁক কাজে লাগিয়ে ওয়েডসন, প্লাজারা হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে শুরু করলেন প্রতি আক্রমণে।
বেঙ্গালুরুর স্পেনীয় কোচ বার্সেলোনায় সহকারি থাকার কারণে ৪-৩-৩ ছকে বিশ্বাসী। কিন্তু মর্গ্যানের পাঁচজনের মাঝমাঠ তাঁর তিন মিডফিল্ডার লেনি-ওয়াটসন-লিংদোকে স্বস্তি দেয়নি। সুনীল ছেত্রীকে বারবারই নেমে আসতে হয় নিচে। আর, এএফসি কাপ ফাইনালের পর থেকে মাঠে আরও একটি খারাপ দিন গেল সুনীলের। মেহতাবের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে দুজনে হলুদ কার্ড দেখা ছাড়া সুনীলের অবদান ছিল দুটি শট, যা বাঁচাতে খুব বেশি কসরত করতে হয়নি ইস্টবেঙ্গলের গোলরক্ষক রেহনেশকে।
ম্যাচে প্রথমে গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল অবশ্য গতবারের চ্যাম্পিয়নরাই। বাঁদিক দিয়ে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছিলেন লিংদো। বক্সের মাঝখানে বল রেখেছিলেন, মাটিঘেঁষা। ছ’গজের বক্সের ঠিক বাইরে থেকে বিনীত বিনা বাধায় বল গোলে রেখে যান। তাঁর আই লিগে পঞ্চম গোল। লাল হলুদের কোনও ডিপ ডিফেন্ডার তাঁকে ‘মার্ক’ করেননি।
কিন্তু বেশিক্ষণ পিছিয়ে থাকেনি ইস্টবেঙ্গল। নিজেদের প্রথম কর্নারে বিপদের গন্ধ ছিল, দ্বিতীয় কর্নার থেকে গোল। ডিকা বক্সে বল না তুলে পাস দিয়েছিলেন ওয়েডসনকে। তিনি ফিরিয়ে দেন ডিকার পায়ে। বাঁদিক দিয়ে এগিয়ে ডিকা গোলমুখে গড়ানো বল রেখেছিলেন। বেঙ্গালুরু-র কোনও ডিফেন্ডার ছিলেন না, গোলমুখে বুকেনিয়াকে আটকাতে। তিনটি গোল করে ফেললেন স্টপার বুকেনিয়া। উগান্ডার ডিফেন্ডার ম্যাচের সেরাও।
৪০ মিনিটে ২-১ হওয়া উচিত ছিল লালহলুদের। ওয়েডসন বল দিয়েছিলেন প্লাজার দিকে। কিন্তু এগিয়ে এসেছিলেন স্পেনীয় ডিফেন্ডার। তাঁকে ‘নাটমেগ’ করে অর্থাৎ পায়ের ফাঁক দিয়ে ছোট টোকায় বলটা বের করে সামনে ফাঁকা জমি পেয়ে যান প্লাজা। কিন্তু বল নিয়ে বড় বক্সের কাছে পৌঁছে কেমন যেন দিশেহারা! শট সোজা অমরিন্দরের হাতে।
তার তিন মিনিটের মধ্যেই বেঙ্গালুরুর সামনে সুযোগ এসেছিল আবারও এগিয়ে যাওয়ার। বক্সের মধ্যে বুকেনিয়ার আলতো হেডে বল বিপন্মুক্ত হওয়ার ফলে পৌঁছে গিয়েছিল লিংদোর পায়ে। তাঁর জোরালো শট বাঁচান রেহনেশ। ফিরতি বল ধরে সুনীল অবশ্য বিশেষ কিছু করতে পারেননি।
দ্বিতীয়ার্ধে মেহতাবের দুর্দান্ত থ্রু বল পেয়ে গিয়েছিলেন অনূর্ধ্ব ২২ নিখিল পূজারি। কিন্তু বিপদ বুঝে এগিয়ে এসেছিলেন অমরিন্দরও। নিখিলের শট অমরিন্দরের বুকে লেগে ফিরে আসে, ৫৭ মিনিটে। এমন সুযোগগুলো থেকে বড় ম্যাচে গোল পেলে নায়ক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা নিশ্চিতভাবেই হারিয়েছিলেন নিখিল।
তারপরই শুরু হয় প্লাজার গোলনষ্টের পালা। ৬২ মিনিটে সামনে একা অমরিন্দর। প্লাজার প্রাথমিক জড়তায় অমরিন্দর সামলে নেন নিজেকে। ৭৬ মিনিটে রবিন এবার সাজিয়ে দিয়েছিলেন বাঁদিক দিয়ে। পায়ে-বলে করতে পারলেই গোল। ত্রিনিদাদের স্ট্রাইকার বল ছুঁতেই পারেননি। একই কাজ প্লাজা করেন ইনজুরি টাইমে। এবার ওয়েডসন তাঁকে যে বল বাড়িয়েছিলেন, ফাঁকা গোল সামনে, তিনি একা, কেউ কোথাও নেই। তবু, প্লাজার পা খুঁজে পেল না বলের ঠিকানা। ৯০ মিনিটে দুর্দান্ত প্রচেষ্টা ছিল ওয়েডসনের। দূর থেকে ডানপায়ের বাঁকানো শট অমরিন্দর কোনও রকমে শরীর ছুঁড়ে বাঁচিয়ে দেন।
রবিন নিজেও অবশ্য দোষী ছিলেন, ৬৮ মিনিটে। তাঁর বাঁপায়ের শট বাঁচাতে বিশেষ কষ্ট করতে হয়নি অমরিন্দরকে। তবে, ৭৪ মিনিটে তাঁর দূরপাল্লার শট অমরিন্দরকে পরাস্ত করে বারে লেগে ফিরে আসে। আর কাজের কাজ করে ফেলেন ৭৯ মিনিটে। জন জনসনের ব্যাকহেড থেকে বল পেয়ে। প্লাজা পাশ দিয়ে সারাক্ষণ দৌড়ে বেঙ্গালুরু ডিফেন্ডারদের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটিয়ে গেলেন, মাথা ঠান্ডা রেখে রবিন পরাস্ত করেন অমরিন্দরকে, বাঁপায়ের শটে। নিজের পুরনো ক্লাবের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোল রবিনের।
দ্বিতীয়ার্ধের ৪৫ মিনিট দেখিয়ে গেল, ক্রমাগত চাপ বাড়াতে পারলে পেশাদার ক্লাব বেঙ্গালুরুকেও ভঙ্গুর দেখায়, কান্তিরাভার বাইরে। চার ম্যাচে ১০ নিয়ে বেঙ্গালুরুর ওপরে উঠে এল ইস্টবেঙ্গল। পরের অ্যাওয়ে ম্যাচে মিনার্ভার বিরুদ্ধে খেলার আগে যা বড় প্রাপ্তি, নিঃসন্দেহে।
ইস্টবেঙ্গল: রেহনেশ ; রাহুল, গুরবিন্দর, বুকেনিয়া, নারায়ণ; ডিকা, মেহতাব (রোওলিন ৮৫), ওয়েডসন; নিখিল, প্লাজা, আমিরভ (রবিন ৪৬)।
No comments