ডোপিং হাউইবাজির রিংটোন, ‘আমিও ফ্লো জো-র মতো হারিয়ে যাব…’
কাশীনাথ ভট্টাচার্য
[caption id="attachment_902" align="alignleft" width="300"]
শেষ হইয়াও ‘শেষ ’হয়নি যে-দৌড়! সোল অলিম্পিক্স, ১৯৮৮, সোনা জিতেছিলেন বেন জনসন। ডোপ-কলঙ্কে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল সেই সোনার পদক। ছবি - ইন্টারনেট[/caption]
মানুষ বড় লোভী। উচ্চ তার আশা। কোনও পথই পরিহার্য নয়। শেষ নেই চাহিদার। আরও আরও আরও দাও। 'প্রাণ' নয়। তা রবীন্দ্রনাথের একান্ত। বাকিরাও আছে বিশ্বকবির কাছে। এ জগতে হায় সে-ই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি।
খেলায় একটু অন্যরকম। কাঙালের ধন চুরি করতেই হবে, নেই বাধ্যবাধকতা। সব সময় সেটাই রাস্তা নয়। নিজেকে পুড়িয়ে উড়িয়ে দিতে হবে। হাউই করে। ওই আকাশপানে ছুটে চলা। ওঠার সময় থেকেই সবার দৃষ্টি ঊর্ধ্বমুখী। অতগুলো অবাক চোখের সামনে আরও ওপরে যাওয়ার লক্ষ্যটা বড়। কিন্তু নিজেকে ফুরিয়ে দিয়ে। বাজিতে নিজের জীবন!
কলঙ্ক? সে আবার কী! কারও ক্ষতি তো করিনি। নিজেকে জ্বালিয়েছি। জ্বলে-পুড়ে মরল রাধা। আমিও মরছি। খ্যাতির বাসনায়। আকাঙ্ক্ষার বিষ দংশেনি যারে, বুঝবে কী?
তাই মানুষ ডোপ করে। ইতিহাস লিখতে চায়। শেখানো হয়েছে তাকে। ছুটতে হবে দ্রুততর। উঠতে হবে শীর্ষে। সবাইকে পেছনে ফেলে। হাউই আকাশে উড়ে গেলে পড়ে থাকে যে ধোঁয়া-ভরা বোতল শুধু!
এভাবেও চৌর্যবৃত্তিকে উৎসাহিত করা হয়। মানবতার দুচ্ছাই গেয়ে। 'স্যাক্রিফাইস' এ নয়। সত্ত্বার বিসর্জন জরুরি নিজের কাজে। খেলায় উন্নততর হতে পরিশ্রমই পথ, একমাত্র। ওষুধের শর্টকাট নয়। ল্যাবরেটরিতে নয়, উন্নতি মাঠে। খেয়ে নয়, খেলে। প্রতিজ্ঞায় জেসি ওয়েন্সের কাছে মুখচুন হিটলার। ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিক্স। একার পায়ে চার সোনা! ম্লেচ্ছ অনার্যের জয়গান। ওষুধ লাগেনি। অলিম্পিক্সের চেয়ে বড় ‘ডোপ’ আবার কী?
ওদিকে লজ্জায় মুখ পোড়ে দিয়েগো মারাদোনার। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেঁদেকেটে একসা বিদায়। ধরা পড়লেই চিরকালীন অজুহাত। ‘আমি নির্দোষ, ফাঁসানো হল’! যা হতে তুলে নিয়েছেন আজকের ভারতের নরসিং যাদব, ইন্দরজিৎ সিংরা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের মাস দুই আগে থেকে কী করে ওজন-কমানো, পেশিশক্তি বাড়ানো, বিশ্বমঞ্চের উপযুক্ত শারীরিক অবস্থায় পৌঁছনো – সব মিথ্যে। শুধু সত্যি, তাঁর ধর্মপুত্র সত্ত্বা! তাতে বিশ্বাসীরও অভাব নেই! কেউ বলবর্ধক নিষিদ্ধ ওষুধ খায়। কিছু মানুষ আবার ‘খায়’ সেই নির্দোষ-তত্ত্ব, ফাঁসানোর ভান। কিন্তু, মারাদোনা হোন বা শেন ওয়ার্ন, নিষিদ্ধ ওষুধ খেলে বিশ্বকাপ থেকে কলঙ্কিত নির্বাসন নিশ্চিত। অর্জিত দক্ষতার বিকল্প কখনও ওষুধ-কলঙ্ক নয়।
'মরিয়া' শারাপোভারা নির্বাসিত ‘হইয়া’ প্রমাণ করেন, চালাকির দ্বারা গ্র্যান্ড স্লাম হয় না। ওষুধ-সঙ্গে সর্বনাশ বেন জনসনের ডোপ-বলিষ্ঠ ৯.৭৯ সেকেন্ডের চেয়ে ০.২১ সেকেন্ড কমিয়ে দেয় উসেইনের বিদ্যুৎ, ১০০ মিটারে। ৯.৬০ সেকেন্ডের কমে ১০০ মিটার দৌড় অভাবনীয়। সেই বার্লিনেই বিদ্যুৎ-ঝলক, আবার, ৯.৫৮ সেকেন্ডে। দক্ষতা অর্জিত নিষ্ঠা, পরিশ্রম, সাধনায়। সব সময় যা এগিয়ে থাকে, এগিয়ে দেয়। ওদিকে বার্লিনে ভেঙে পড়ে দেওয়াল। খবর আসে, রাষ্ট্র কী করে এগিয়ে দিচ্ছিল অলিম্পিকে। মেয়ে-অ্যাথলিট, মহিলা-সাঁতারুদের গোঁফের রেখা স্পষ্ট, টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে। ব্ল্যাঙ্কেট-ডোপিং, পূর্ব ইউরোপজুড়ে। অলিম্পিক-পদকের স্বপ্নে, রাষ্ট্র-অনুমোদিত, রাষ্ট্রই পৃষ্ঠপোষক। কম্বল-চাপা, যাতে ধরা না-পড়ে। যখন পড়ে, কিছু করার থাকে না। রাশিয়া যেমন, এখনও। গোটা দেশই নির্বাসিত প্রায়।
কিংবা ল্যান্স আর্ম‘উইক’। আর্ম যদি সত্যিই ‘স্ট্রং’ কেন ব্লাড ডোপিং-এর বৈশাখী? কেন জীবন নিয়ে খেলা? জীবনের চেয়েও যে দামি পদক, খ্যাতি, অর্থ! ধরা না-পড়লেই তো ‘স্ট্রং’ তখন ‘স্ট্রংগেস্ট’! ‘ডোপ করে ল্যান্সের মতো সাইকেল চালিয়ে তুর দে ফ্রাঁস জিতে দেখাক’, অত্যন্ত কুযুক্তি, যা চুরির মানসিকতাকে সমর্থন করতে চায়, নিজের অক্ষমতা ঢাকতে চৌর্যবৃত্তির জয়গান গেয়ে। খেলার স্বাভাবিকতাকে আরও কলুষিত করতে চেয়ে। এমন মানসিকতাকে যত নিরুৎসাহিত করা যায়, মঙ্গল। খেলা সুস্থ জীবনের দিকে নিয়ে যায় মানুষকে, জীবনদায়ী। অসুস্থ মানসিকতার পূজারি বা প্রযুক্তির প্রভাবে প্রাণহানিকর নয় খেলা, কখনও। মারাদোনা, মারিয়ন জোন্স, মারিয়া শারাপোভা থাকলে মাইকেল জর্ডন, মাইকেল জনসন, মাইকেল ফেল্পসও আছেন, সগৌরবে, সসম্মানে!
ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ জয়নার ছিলেন। আজও মেয়েদের ১০০ মিটার আর ২০০ মিটারে সোল অলিম্পিক্সে বিশ্বরেকর্ড তাঁর। ছোঁওয়া দূরের কথা, কাছাকাছিও যাওয়া যায়নি গত ২৮ বছরে। আর ফ্লো জো নিজে? ১৯৮৮ অলিম্পিক্সের পরই অবসর নিয়েছিলেন। আটত্রিশেই হারিয়ে গিয়েছেন জীবন থেকে। ঘুমের মধ্যে চিরঘুমে। সন্দেহ থেকেই গিয়েছে, এখনও।
যারা তাঁকে মেনে চলেন, সেই অ্যাথলিটদের এই ডোপিং হাউইবাজির রিংটোন, ‘আমিও ফ্লো জো-র মতো হারিয়ে যাব…’
[caption id="attachment_902" align="alignleft" width="300"]
মানুষ বড় লোভী। উচ্চ তার আশা। কোনও পথই পরিহার্য নয়। শেষ নেই চাহিদার। আরও আরও আরও দাও। 'প্রাণ' নয়। তা রবীন্দ্রনাথের একান্ত। বাকিরাও আছে বিশ্বকবির কাছে। এ জগতে হায় সে-ই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি।
খেলায় একটু অন্যরকম। কাঙালের ধন চুরি করতেই হবে, নেই বাধ্যবাধকতা। সব সময় সেটাই রাস্তা নয়। নিজেকে পুড়িয়ে উড়িয়ে দিতে হবে। হাউই করে। ওই আকাশপানে ছুটে চলা। ওঠার সময় থেকেই সবার দৃষ্টি ঊর্ধ্বমুখী। অতগুলো অবাক চোখের সামনে আরও ওপরে যাওয়ার লক্ষ্যটা বড়। কিন্তু নিজেকে ফুরিয়ে দিয়ে। বাজিতে নিজের জীবন!
কলঙ্ক? সে আবার কী! কারও ক্ষতি তো করিনি। নিজেকে জ্বালিয়েছি। জ্বলে-পুড়ে মরল রাধা। আমিও মরছি। খ্যাতির বাসনায়। আকাঙ্ক্ষার বিষ দংশেনি যারে, বুঝবে কী?
তাই মানুষ ডোপ করে। ইতিহাস লিখতে চায়। শেখানো হয়েছে তাকে। ছুটতে হবে দ্রুততর। উঠতে হবে শীর্ষে। সবাইকে পেছনে ফেলে। হাউই আকাশে উড়ে গেলে পড়ে থাকে যে ধোঁয়া-ভরা বোতল শুধু!
এভাবেও চৌর্যবৃত্তিকে উৎসাহিত করা হয়। মানবতার দুচ্ছাই গেয়ে। 'স্যাক্রিফাইস' এ নয়। সত্ত্বার বিসর্জন জরুরি নিজের কাজে। খেলায় উন্নততর হতে পরিশ্রমই পথ, একমাত্র। ওষুধের শর্টকাট নয়। ল্যাবরেটরিতে নয়, উন্নতি মাঠে। খেয়ে নয়, খেলে। প্রতিজ্ঞায় জেসি ওয়েন্সের কাছে মুখচুন হিটলার। ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিক্স। একার পায়ে চার সোনা! ম্লেচ্ছ অনার্যের জয়গান। ওষুধ লাগেনি। অলিম্পিক্সের চেয়ে বড় ‘ডোপ’ আবার কী?
ওদিকে লজ্জায় মুখ পোড়ে দিয়েগো মারাদোনার। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেঁদেকেটে একসা বিদায়। ধরা পড়লেই চিরকালীন অজুহাত। ‘আমি নির্দোষ, ফাঁসানো হল’! যা হতে তুলে নিয়েছেন আজকের ভারতের নরসিং যাদব, ইন্দরজিৎ সিংরা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের মাস দুই আগে থেকে কী করে ওজন-কমানো, পেশিশক্তি বাড়ানো, বিশ্বমঞ্চের উপযুক্ত শারীরিক অবস্থায় পৌঁছনো – সব মিথ্যে। শুধু সত্যি, তাঁর ধর্মপুত্র সত্ত্বা! তাতে বিশ্বাসীরও অভাব নেই! কেউ বলবর্ধক নিষিদ্ধ ওষুধ খায়। কিছু মানুষ আবার ‘খায়’ সেই নির্দোষ-তত্ত্ব, ফাঁসানোর ভান। কিন্তু, মারাদোনা হোন বা শেন ওয়ার্ন, নিষিদ্ধ ওষুধ খেলে বিশ্বকাপ থেকে কলঙ্কিত নির্বাসন নিশ্চিত। অর্জিত দক্ষতার বিকল্প কখনও ওষুধ-কলঙ্ক নয়।
'মরিয়া' শারাপোভারা নির্বাসিত ‘হইয়া’ প্রমাণ করেন, চালাকির দ্বারা গ্র্যান্ড স্লাম হয় না। ওষুধ-সঙ্গে সর্বনাশ বেন জনসনের ডোপ-বলিষ্ঠ ৯.৭৯ সেকেন্ডের চেয়ে ০.২১ সেকেন্ড কমিয়ে দেয় উসেইনের বিদ্যুৎ, ১০০ মিটারে। ৯.৬০ সেকেন্ডের কমে ১০০ মিটার দৌড় অভাবনীয়। সেই বার্লিনেই বিদ্যুৎ-ঝলক, আবার, ৯.৫৮ সেকেন্ডে। দক্ষতা অর্জিত নিষ্ঠা, পরিশ্রম, সাধনায়। সব সময় যা এগিয়ে থাকে, এগিয়ে দেয়। ওদিকে বার্লিনে ভেঙে পড়ে দেওয়াল। খবর আসে, রাষ্ট্র কী করে এগিয়ে দিচ্ছিল অলিম্পিকে। মেয়ে-অ্যাথলিট, মহিলা-সাঁতারুদের গোঁফের রেখা স্পষ্ট, টেস্টোস্টেরনের প্রভাবে। ব্ল্যাঙ্কেট-ডোপিং, পূর্ব ইউরোপজুড়ে। অলিম্পিক-পদকের স্বপ্নে, রাষ্ট্র-অনুমোদিত, রাষ্ট্রই পৃষ্ঠপোষক। কম্বল-চাপা, যাতে ধরা না-পড়ে। যখন পড়ে, কিছু করার থাকে না। রাশিয়া যেমন, এখনও। গোটা দেশই নির্বাসিত প্রায়।
কিংবা ল্যান্স আর্ম‘উইক’। আর্ম যদি সত্যিই ‘স্ট্রং’ কেন ব্লাড ডোপিং-এর বৈশাখী? কেন জীবন নিয়ে খেলা? জীবনের চেয়েও যে দামি পদক, খ্যাতি, অর্থ! ধরা না-পড়লেই তো ‘স্ট্রং’ তখন ‘স্ট্রংগেস্ট’! ‘ডোপ করে ল্যান্সের মতো সাইকেল চালিয়ে তুর দে ফ্রাঁস জিতে দেখাক’, অত্যন্ত কুযুক্তি, যা চুরির মানসিকতাকে সমর্থন করতে চায়, নিজের অক্ষমতা ঢাকতে চৌর্যবৃত্তির জয়গান গেয়ে। খেলার স্বাভাবিকতাকে আরও কলুষিত করতে চেয়ে। এমন মানসিকতাকে যত নিরুৎসাহিত করা যায়, মঙ্গল। খেলা সুস্থ জীবনের দিকে নিয়ে যায় মানুষকে, জীবনদায়ী। অসুস্থ মানসিকতার পূজারি বা প্রযুক্তির প্রভাবে প্রাণহানিকর নয় খেলা, কখনও। মারাদোনা, মারিয়ন জোন্স, মারিয়া শারাপোভা থাকলে মাইকেল জর্ডন, মাইকেল জনসন, মাইকেল ফেল্পসও আছেন, সগৌরবে, সসম্মানে!
ফ্লোরেন্স গ্রিফিথ জয়নার ছিলেন। আজও মেয়েদের ১০০ মিটার আর ২০০ মিটারে সোল অলিম্পিক্সে বিশ্বরেকর্ড তাঁর। ছোঁওয়া দূরের কথা, কাছাকাছিও যাওয়া যায়নি গত ২৮ বছরে। আর ফ্লো জো নিজে? ১৯৮৮ অলিম্পিক্সের পরই অবসর নিয়েছিলেন। আটত্রিশেই হারিয়ে গিয়েছেন জীবন থেকে। ঘুমের মধ্যে চিরঘুমে। সন্দেহ থেকেই গিয়েছে, এখনও।
যারা তাঁকে মেনে চলেন, সেই অ্যাথলিটদের এই ডোপিং হাউইবাজির রিংটোন, ‘আমিও ফ্লো জো-র মতো হারিয়ে যাব…’
No comments